জ্বালানি খাতের সংস্কার ও কর ব্যবস্থাপনা সহজ করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিল অন্তর্বর্তী সরকার। লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি (LPG) খাতের বিদ্যমান জটিল কর কাঠামো ভেঙে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এখন থেকে উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে থাকা ভ্যাট (VAT) এবং অগ্রিম কর তুলে দিয়ে শুধুমাত্র আমদানি পর্যায়ে এককভাবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের বিশ্বাস, এই ‘ট্যাক্স সিমপ্লিফিকেশন’ বা কর সরলীকরণের ফলে রাজস্ব আদায় যেমন স্বচ্ছ হবে, তেমনি ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও লাঘব হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
এলপিজি কর কাঠামো পুনর্গঠন ও ডিজিটাল স্বচ্ছতা
বৈঠক পরবর্তী সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, আগের নিয়ম অনুযায়ী এলপিজির উৎপাদন ও ব্যবসায়িক পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানির সময় ২ শতাংশ অগ্রিম কর (Advance Tax) দিতে হতো। নতুন কাঠামোতে এই বহুস্তর বিশিষ্ট কর ব্যবস্থা বাতিল করে আমদানি পর্যায়েই ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে করে কর আদায়ের প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি সরাসরি এবং হয়রানিমুক্ত হবে। মূলত জ্বালানি বাজারের ভারসাম্য রক্ষা এবং কর ফাঁকি রোধে এই ‘ওয়ান-পয়েন্ট ট্যাক্সেশন’ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
অবৈধ গ্যাস সংযোগে কঠোর ‘বাংলাদেশ গ্যাস অধ্যাদেশ ২০২৬’
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পদ্ধতিগত লোকসান (System Loss) কমাতে ‘বাংলাদেশ গ্যাস (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬’-এর খসড়া নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে সরকার। নতুন এই অধ্যাদেশে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এখন থেকে কেবল অবৈধ সংযোগ গ্রহণকারীই নয়, বরং যে ঠিকাদার বা ব্যক্তি এই সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করবেন, তাদের কর্মকাণ্ডকেও গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
সংশোধিত আইনে মিটারযুক্ত (Metered) ও নন-মিটার গ্রাহকদের জন্য পৃথক দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া কোনো ভবনে অবৈধ সংযোগ থাকলে তার মালিক এবং সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানির অসাধু কর্মকর্তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হবে। হাজার হাজার কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ রক্ষায় এই কঠোর আইনি কাঠামো অপরিহার্য ছিল বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
ক্ষমতা হস্তান্তর ও বিভ্রান্তি নিরসন
নির্বাচন পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে চলমান গুঞ্জন ও অপপ্রচার বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন প্রেস সচিব। শফিকুল আলম জানান, নির্বাচনের পর যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত হলে তিন দিনের মধ্যেই ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব। আমাদের ধারণা, এটি ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির বেশি দেরি হবে না।”
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহলের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, সরকার ১৮০ কার্যদিবস ক্ষমতা ধরে রাখবে—এমন তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং অসৎ উদ্দেশ্যমূলক। সরকার প্রথম থেকেই নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আসন্ন রমজানে নতুন অফিস সময়সূচি
পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন অফিস সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু হতে পারে—এমন সম্ভাবনা সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, রমজানে সব সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অফিস চলবে। জোহরের নামাজের জন্য দুপুর ১টা থেকে ১টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত বিরতি থাকবে।
উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব ও জাতীয় পুরস্কার
উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব জানান, উপদেষ্টাদের দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার আগে বা সময় ঘনিয়ে এলে দেশবাসী তাদের সম্পদের হিসাব দেখতে পাবেন। এ নিয়ে লুকোছাপার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া জাতীয় পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে আগের ‘পারিবারিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ ভেঙে যোগ্যদের মূল্যায়নের মাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।