মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitics) অস্থিরতার পারদ চড়তে থাকায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন জাহাজগুলোকে ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা (Territorial Waters) থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই নতুন নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রকাশ করে।
ক্যাপ্টেনদের বিশেষ সতর্কবার্তা: ‘বোর্ডিং’ করতে দেওয়া যাবে না নতুন জারি করা নির্দেশিকায় মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেনদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, কোনো অবস্থাতেই ইরানি বাহিনীকে মার্কিন জাহাজে ওঠার বা ‘বোর্ডিং’ করার অনুমতি দেওয়া যাবে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই জলপথে যাতায়াতের সময় ইরানের সীমানা এড়িয়ে ওমানের আঞ্চলিক সমুদ্রের কাছাকাছি রুট (Maritime Route) ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে পূর্ব দিকে চলাচলের সময় ওমান উপকূলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনা ও নেপথ্যের অস্থিরতা গত শুক্রবার ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা (Indirect Talks) অনুষ্ঠিত হওয়ার পরপরই এই নতুন নির্দেশিকা এল। যদিও দুই দেশ আলোচনার টেবিলে বসেছিল, তবে মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধের হুমকি এবং বাগযুদ্ধ থামেনি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরে চলমান সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের ওপর সম্ভাব্য আঘাত রুখতেই এই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।
হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। মার্কিন সরকার এই এলাকাটিকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনার্জি ট্রানজিট রুট’ হিসেবে বর্ণনা করে। এর আগে জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এই প্রণালীতে বড় ধরনের নৌ-মহড়া পরিচালনা করলে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়। সে সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানকে ‘অপেশাদার এবং অনিরাপদ’ আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছিল।
ট্যাঙ্কার যুদ্ধের তিক্ত স্মৃতি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার ইতিহাস এই অঞ্চলে বেশ পুরনো। ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় উভয় দেশই একে অপরের বাণিজ্যিক জাহাজ এবং অয়েল ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়েছিল, যা ইতিহাসে ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ (Tanker War) নামে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা শুরু করায় সেই পুরনো আতঙ্ক আবারও ফিরে এসেছে। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে হুতিদের এই তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক মেরিটাইম সিকিউরিটি বা নৌ-নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বিশ্বজুড়ে শিপিং লেন (Shipping Lane) এবং সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের এই নির্দেশিকা প্রমাণ করছে যে, সংঘাতের ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন প্রশাসন এখন অত্যন্ত রক্ষণশীল কৌশল অবলম্বন করছে।