বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতা ও ঐতিহ্যের জানান দিতে এক অভাবনীয় ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নিয়েছে ভিয়েতনাম। দেশটির রাজধানী হ্যানয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম স্টেডিয়াম, যার নাম রাখা হয়েছে ‘ট্রং ডং স্টেডিয়াম’ (Trong Dong Stadium)। ১ লাখ ৩৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই বিশালাকার ভেন্যুটি আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যা ও ভিয়েতনামের আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সংস্কৃতির এক অনন্য মিশেল হতে যাচ্ছে।
প্রাচীন ঐতিহ্যের আধুনিক প্রতিচ্ছবি
স্টেডিয়ামটির নকশা করা হয়েছে ভিয়েতনামের হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য ‘ডং সন ব্রোঞ্জ ড্রাম’ (Dong Son Bronze Drum)-এর আদলে। প্রাচীন ভিয়েতনামি সভ্যতার প্রতীক এই ঢোল শক্তি, একতা এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। হ্যানয় সরকারের কর্মকর্তাদের মতে, এই নকশার মাধ্যমে ভিয়েতনামের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হবে। এটি কেবল একটি খেলার মাঠ নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান এই দেশটির জাতীয় গর্ব ও আধুনিক স্থাপত্যের এক ‘আইকনিক’ নিদর্শন হয়ে উঠবে।
রেকর্ড ভাঙা ধারণক্ষমতা: উত্তর কোরিয়া ও মরক্কোকে পেছনে ফেলার লক্ষ্য
বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম স্টেডিয়ামের স্বীকৃতি রয়েছে উত্তর কোরিয়ার ‘রুংরাডো ১ মে স্টেডিয়াম’-এর দখলে, যার আসন সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার। অন্যদিকে, ২০৩০ বিশ্বকাপ সামনে রেখে মরক্কো নির্মাণ করছে ১ লাখ ১৫ হাজার আসনের ‘হাসান দ্বিতীয় স্টেডিয়াম’। তবে ভিয়েতনামের প্রস্তাবিত ট্রং ডং স্টেডিয়াম ১ লাখ ৩৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা নিয়ে এই সব রেকর্ড ভেঙে বিশ্ব তালিকার শীর্ষে বসতে যাচ্ছে।
২৮ বিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল ‘অলিম্পিক স্পোর্টস সিটি’
এই স্টেডিয়ামটি মূলত ভিয়েতনামের বিশাল এক মহাপরিকল্পনার অংশ, যার নাম ‘অলিম্পিক স্পোর্টস সিটি’ (Olympic Sports City)। পুরো প্রকল্পে আবাসিক এলাকা এবং অত্যাধুনিক ক্রীড়া পরিকাঠামো বা ‘Sports Infrastructure’ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৮ বিলিয়ন পাউন্ড। কর্মকর্তাদের মতে, লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম (Wembley Stadium), চীনের বার্ডস নেস্ট (Bird’s Nest) কিংবা কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম (Lusail Stadium) যেমন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বৈশ্বিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে, ট্রং ডং স্টেডিয়ামও ভিয়েতনামকে সেই উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও পরিবেশবান্ধব সমাধান
আধুনিক দর্শকদের কথা মাথায় রেখে এতে যুক্ত করা হচ্ছে ‘হাই-টেক’ সব সুবিধা। স্টেডিয়ামটিতে থাকবে বিশ্বের বৃহত্তম ‘রিট্র্যাকটেবল রুফ’ (Retractable Roof) বা খোলা-বন্ধ করা যায় এমন ছাদ। এছাড়া পুরো প্রজেক্টে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘এনার্জি এফিসিয়েন্ট’ (Energy Efficient) বা জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ (Eco-friendly Materials) ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের স্বপ্ন
হ্যানয়কে কেন্দ্র করে নেওয়া এই মেগা প্রজেক্টের লক্ষ্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ভিয়েতনাম ভবিষ্যতে ফুটবল বিশ্বকাপ (World Cup) কিংবা অলিম্পিকের (Olympics) মতো মেগা ইভেন্ট আয়োজনের সক্ষমতা অর্জন করতে চায়। ট্রং ডং স্টেডিয়ামের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, “আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মানচিত্রে ভিয়েতনামের অবস্থান সুসংহত করতে এবং বৈশ্বিক সংযুক্তির চাহিদা পূরণে এই জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা আমাদের একটি কৌশলগত রোডম্যাপ।”
নির্মাণকাল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
গত ডিসেম্বর মাসে এই মেগা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ‘গ্রাউন্ড ব্রেকিং’ বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মূল স্টেডিয়ামটির নির্মাণকাজ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে পুরো অলিম্পিক স্পোর্টস সিটি প্রকল্প, যার মধ্যে উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এবং নতুন নগর এলাকা অন্তর্ভুক্ত, তা ২০৩৫ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থাপত্য, ঐতিহ্য আর প্রযুক্তির এই ত্র্যহস্পর্শে নির্মিত হতে যাওয়া ট্রং ডং স্টেডিয়াম কেবল ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় নয়, বরং পুরো এশীয় ক্রীড়াঙ্গনের এক নতুন দিকপাল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।