যশোরের রাজনীতির ‘নার্ভ সেন্টার’ হিসেবে পরিচিত যশোর-৩ (সদর) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ের অবসান ঘটেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৯০টি ভোটকেন্দ্রের সব কটির প্রাপ্ত ফলাফলে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। ধানের শীষ প্রতীকের এই প্রার্থীর জয়ের মধ্য দিয়ে যশোর সদর আসনে রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন সমীকরণ তৈরি হলো।
সেয়ানে সেয়ানে লড়াই ও ভোটের ব্যবধান নির্বাচন কমিশনের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯০টি কেন্দ্রে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর অনিন্দ্য ইসলাম অমিত পেয়েছেন ১,৭৩,০২৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী (দাঁড়িপাল্লা প্রতীক) মো. আব্দুল কাদের পেয়েছেন ১,৬৫,১২৯ ভোট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পূর্বানুমান অনুযায়ী, দুই প্রার্থীর মধ্যে একটি ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যার প্রতিফলন ঘটেছে ভোটের ব্যবধানে। মাত্র ৭,৮৯৪ ভোটের ব্যবধানে জামায়াত প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন প্রয়াত জননেতা তরিকুল ইসলামের পুত্র অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
নির্বাচনী মাঠের চিত্র ও ভোটার উপস্থিতি যশোর সদর উপজেলার (বাসুন্দিয়া ইউনিয়ন ব্যতীত) এই আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৬,১৩,৪৬০ জন। এর মধ্যে ৩,০৭,৫৪৯ জন পুরুষ এবং ৩,০৫,৯০১ জন নারী ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান। নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত এবং ‘ম্যাসিভ টার্নআউট’ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইন নির্বাচনের সামগ্রিক আমেজকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। কোনো বড় ধরনের গোলযোগ ছাড়াই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়াকে গণতন্ত্রের ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা।
তৃণমূলের সক্রিয়তা ও রাজনৈতিক স্লোগান এই নির্বাচনে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে অভাবনীয় উদ্দীপনা দেখা গেছে। দলের পক্ষ থেকে ঘোষিত ‘নির্বাচনই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ’—এই ভিশনারি স্লোগানকে সামনে রেখে Grassroots পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে তাদের সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক শক্তি এবং ক্যাডারভিত্তিক ভোটার ম্যানেজমেন্ট লড়াইকে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে জামায়াত প্রার্থীর শক্ত অবস্থান নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দ্বিমুখী করে তুলেছিল।
ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের জয় অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের এই বিজয় কেবল বিএনপির জয় নয়, বরং তার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের এক নতুন অধ্যায়। যশোরের উন্নয়নের কারিগর হিসেবে পরিচিত তার পিতা তরিকুল ইসলামের উত্তরসূরি হিসেবে অমিতের ওপর যশোরের মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা ছিল। সেই আস্থাকেই তিনি ভোটের মাধ্যমে বাস্তবে রূপদান করেছেন। নির্বাচনের ফলাফল আসার পর ‘পলিটিক্যাল লিগ্যাসি’ এবং ‘পাবলিক ম্যান্ডেট’-এর এক মেলবন্ধন দেখা গেছে যশোরে।
বিজয় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও রাজপথে উৎসব নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই যশোর শহর যেন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনতা রাজপথে নেমে বিজয় মিছিল শুরু করেন। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই বিজয়কে ‘যশোরবাসীর বিজয়’ এবং ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আগামী দিনে যশোরের সুষম উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।