ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এবার সরাসরি সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। তেহরানকে নতুন একটি পারমাণবিক চুক্তিতে (Nuclear Deal) বাধ্য করতে হোয়াইট হাউসের ধৈর্য যে ফুরিয়ে আসছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। আগামী মার্চের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধান না এলে মধ্যপ্রাচ্যে ইতিহাসের অন্যতম ‘বিধ্বংসী’ সামরিক অভিযান চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এই হুমকির বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে পারস্য উপসাগরে বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধুনিক বিমানবাহী রণতরী (Aircraft Carrier) মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র।
পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণহুঙ্কার
স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, মার্কিন নৌবাহিনীর গর্ব ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ খুব শীঘ্রই ক্যারিবীয় অঞ্চল ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। ট্রাম্পের ভাষায়, "এবারের অভিযান হবে আগের চেয়েও ভয়াবহ, যা ইরানকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।"
বর্তমানে পারস্য উপসাগরে পেন্টাগনের (Pentagon) শক্তিশালী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ মোতায়েন রয়েছে। তার সাথে ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ যোগ দিলে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তিমত্তা এক অপরাজেয় উচ্চতায় পৌঁছাবে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত ইরানের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ (Maximum Pressure) কৌশলেরই অংশ। তবে এই বিশাল সামরিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে আরব বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে; তাদের আশঙ্কা, দুই পরাশক্তির এই রেষারেষি যেকোনো মুহূর্তে একটি প্রলয়ঙ্কারী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
মাটির নিচে তেহরানের ‘দুর্ভেদ্য’ দুর্গ
মার্কিন হুমকি ও অর্থনৈতিক অবরোধের মুখেও নতি স্বীকার করতে নারাজ ইরান। বরং উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত সাম্প্রতিক ছবিতে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। কোলাং গাজ লা পাহাড়ের পাদদেশে নিজেদের গোপন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে আরও সুরক্ষিত করছে তেহরান। বিমান হামলা থেকে রক্ষা পেতে টানেলের মুখে শক্তিশালী কংক্রিটের ঢালাই এবং মাটির পুরু আস্তরণ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্থাপনাগুলো ইরান কেবল মেরামতই করেনি, বরং আগের চেয়েও নিরাপদ ও গভীর সুড়ঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (Uranium Enrichment) কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে যেকোনো আকাশপথের হামলা বা ড্রোন অ্যাটাক ঠেকানো এখন আমেরিকার জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও হিট লিস্টের লড়াই
মাঠের লড়াইয়ের সমান্তরালে দুই দেশের মধ্যে চলছে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare)। সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘ওফোগ’-এ একটি বিতর্কিত ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যেখানে মার্কিন মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ সাত কর্মকর্তার একটি ‘হিট লিস্ট’ প্রকাশ করা হয়েছে। ছবির ওপর লক্ষ্যভেদের চিহ্ন (Target Sign) বসিয়ে সরাসরি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে এই তালিকায়।
এর পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ (Mossad) সরাসরি ইরানি নাগরিকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা বার্তায় মোসাদ সাধারণ ইরানিদের তথ্য দিয়ে সহায়তার বিনিময়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দিচ্ছে, যা তেহরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় ফাটল ধরাবার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে সমঝোতা নাকি পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিতে বারুদের গন্ধ—বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে আগামী মার্চের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে।