পাকিস্তানের ক্রিকেটে তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯২ সালে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে পাকিস্তানকে ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতানো সেই ‘ক্যাপ্টেন’ ইমরান খান এখন কারান্তরালে লড়াই করছেন জীবনের এক কঠিনতম সময়ের সঙ্গে। সম্প্রতি খবর চাউর হয়েছে যে, ৭৩ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি তার ডান চোখের অধিকাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। প্রিয় মেন্টর ও অধিনায়কের এমন গুরুতর অসুস্থতার খবরে বিচলিত হয়ে পড়েছেন ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস এবং শোয়েব আখতারের মতো বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটাররা।
দৃষ্টি হারানোর শঙ্কায় ‘স্কিপার’
বেশ কয়েক মাস ধরে নিভৃত কারাবাস এবং যথাযথ চিকিৎসার অভাবে ইমরান খান একটি গুরুতর চোখের সংক্রমণে ভুগছেন। তার ‘Legal Team’ বা আইনজীবী দলের দাবি অনুযায়ী, সংক্রমণ এতটাই ছড়িয়েছে যে তিনি অন্ধত্বের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। পাকিস্তানের হয়ে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে একমাত্র ট্রফি আনা এই অধিনায়কের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে বর্তমানে তোলপাড় চলছে পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক মহলে।
ওয়াসিম-ওয়াকারদের আবেগঘন আর্তি
ইমরান খানের হাত ধরেই বিশ্ব ক্রিকেটে উত্থান হয়েছিল ‘সুইংয়ের সুলতান’ ওয়াসিম আকরামের। প্রিয় অধিনায়কের এমন পরিণতিতে শোকস্তব্ধ ওয়াসিম সামাজিক মাধ্যম ‘X’-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, “আমাদের অধিনায়ক ইমরান খানের অসুস্থতার খবর শুনে আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি যেন তাকে সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার দ্রুত আরোগ্য এবং সম্পূর্ণ সুস্থতা কামনা করছি।”
একই সুরে কথা বলেছেন আরেক কিংবদন্তি পেসার ওয়াকার ইউনিস। রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে মানবতার খাতিরে ইমরানের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তিনি আমাদের জাতীয় নায়ক, যিনি খেলার মাঠে আমাদের সর্বোচ্চ গৌরব এনে দিয়েছেন এবং একটি ‘Cancer Hospital’ প্রতিষ্ঠা করে অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। সেই মানুষটি আজ স্বাস্থ্য সংকটে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ, তাকে দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হোক। দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন, স্কিপার।”
সোচ্চার শোয়েব-আফ্রিদি ও রমিজ রাজারা
পাকিস্তানের গতিদানব শোয়েব আখতার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন ইমরান খানের প্রতিষ্ঠিত শওকত খানম মেমোরিয়াল ক্যান্সার হাসপাতালের তহবিল সংগ্রহের কাজে। সেখান থেকেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “অধিনায়কের দৃষ্টিশক্তি হারানোর খবরটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। তিনি যেন দ্রুততম সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পান, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।”
সাবেক অলরাউন্ডার শহীদ আফ্রিদি এবং পিসিবি-র সাবেক চেয়ারম্যান রমিজ রাজাও ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে সরব হয়েছেন। আফ্রিদি মনে করেন, সুচিকিৎসা পাওয়া যেকোনো মানুষের ‘Basic Human Right’ বা মৌলিক অধিকার। অন্যদিকে, ১৯৯২ বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক জয়সূচক ক্যাচটি ধরা রমিজ রাজা লিখেছেন, “মানবতা যেন জয়ী হয়। ইমরান খানকে এভাবে এক চোখের দৃষ্টি হারাতে দেখা অসহনীয়।”
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিধ্বনি
ইমরান খানের সুচিকিৎসার দাবি কেবল পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতের সাবেক ব্যাটার অজয় জাদেজাও পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাদের প্রিয় অধিনায়কের এই দুঃসময়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আওয়াজ তোলার জন্য। মোহাম্মদ হাফিজও ইমরানের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে বর্তমান প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
পটভূমি: রাজনীতি ও কারাবাস
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দি রয়েছেন ইমরান খান। তার বিরুদ্ধে আনীত একাধিক মামলার পাহাড়কে তিনি এবং তার সমর্থকরা ‘Political Vendetta’ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছেন। তবে আইনি লড়াই ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার স্বাস্থ্যঝুঁকি। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হলেও, কারাগারের দেয়ালের ওপাশে এক সময়ের প্রবল প্রতাপশালী এই ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের শারীরিক অবস্থার অবনতি চিন্তায় ফেলেছে তার কোটি কোটি ভক্তকে।