• আন্তর্জাতিক
  • তারেক রহমানের ‘নতুন বাংলাদেশ’: ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের বরফ কি গলবে?

তারেক রহমানের ‘নতুন বাংলাদেশ’: ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের বরফ কি গলবে?

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
তারেক রহমানের ‘নতুন বাংলাদেশ’: ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের বরফ কি গলবে?

নির্বাচনী ভূমিধস জয়ের পর ভারতের অভিনন্দন ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ—হাসিনা পরবর্তী যুগে এক বিশেষ কূটনৈতিক বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও (Geopolitics) এক নতুন কম্পন সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর ক্ষমতার পালাবদলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্কের সমীকরণ এখন এক বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন নয়াদিল্লির ‘সাউথ ব্লক’ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো সাজাচ্ছে।

মোদি সরকারের উষ্ণ অভিনন্দন ও সতর্ক অবস্থান

বিপুল জনম্যান্ডেট পাওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক বার্তায় তিনি একটি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও স্থিতিশীল’ বাংলাদেশকে সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এই শুভেচ্ছাবার্তার আড়ালে ছিল এক গভীর কূটনৈতিক সতর্কবার্তা। জেন-জি (Gen-Z) এর গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন এবং তার ভারতে আশ্রয় গ্রহণের পর দুই দেশের মধ্যকার ‘Mutual Trust’ বা পারস্পরিক বিশ্বাসে যে ধস নেমেছে, তা মেরামত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ঐতিহাসিক তিক্ততা ও অবিশ্বাসের দেয়াল

নয়াদিল্লির জন্য বিএনপি কোনো ‘অজানা পক্ষ’ নয়। তবে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতি আজও ভারতীয় কূটনীতিকদের স্মৃতিতে অমলিন। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় প্রদান, ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে তখন ভারত ও বিএনপির মধ্যে যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা মেটাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারত এবারও ‘সিকিউরিটি কনসার্ন’ বা নিরাপত্তা ইস্যুকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। লন্ডনের সোয়াস (SOAS) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, “নির্বাচনী দৌড়ে থাকা দলগুলোর মধ্যে বিএনপিই এখন ভারতের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প। তবে প্রশ্ন হলো, তারেক রহমান কীভাবে দেশ শাসন করবেন? তিনি মুখে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্থিতিশীলতার কথা বললেও বাস্তবে সেটি কার্যকর করা কঠিন হবে।”

‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ ও প্রত্যর্পণ বিতর্ক

ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICT) মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে প্রবল ‘Anti-India Sentiment’ বা ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ হলো হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনে ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থন। এখন তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আইনি ও কূটনৈতিক চাপ (Extradition Request) তারেক রহমানের সরকারের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা। ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, হাসিনা যদি নিজের ভুল স্বীকার না করে ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করেন, তবে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে পড়বে।

পাকিস্তানের সাথে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা: ভারতের নয়া দুশ্চিন্তা

শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে শুরু করেছে। দীর্ঘ ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হওয়া এবং সামরিক পর্যায়ে কর্মকর্তাদের যাতায়াত ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ২০২৪-২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়ক বলেন, “সার্বভৌম দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রাখার অধিকার বাংলাদেশের আছে। তবে শঙ্কা হলো, সম্পর্কের পাল্লা যদি ভারতের দিক থেকে পুরোপুরি ঘুরে পিন্ডির দিকে ঝুঁকে যায়, তবে তা আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।”

সবার আগে বাংলাদেশ: তারেক রহমানের ‘Strategic Autonomy’

তারেক রহমান সম্প্রতি এক জনসভায় স্লোগান দিয়েছেন— ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’। এই বার্তার মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তার সরকার কোনো বিশেষ বলয়ের ওপর নির্ভরশীল হবে না। বরং বাংলাদেশের ‘National Interest’ বা জাতীয় স্বার্থই হবে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান ভিত্তি। সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পানির ন্যায্য হিস্যা এবং বাণিজ্যের বাধা অপসারণের মতো ইস্যুগুলোতে ভারত যদি নমনীয় না হয়, তবে বিএনপির পক্ষে জনগণের সেন্টিমেন্ট জয় করা কঠিন হবে।

উপসংহার: সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই সম্পর্ক নির্ভর করবে উভয় পক্ষের ‘Reciprocity’ বা পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার ওপর। ভারত যদি বাংলাদেশকে তাদের ‘পুতুল রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখার মানসিকতা ত্যাগ করে একটি সার্বভৌম অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করে এবং বিএনপি যদি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে (Security Cooperation) গুরুত্ব দেয়, তবেই কেবল দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে স্থিতিশীল ও সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

Tags: bangladesh election sheikh hasina india bangladesh tareq rahman south asia trade relations geopolitics news bnp india modi message pakistan factor border killings diplomatic analysis.