রপ্তানির নতুন দিগন্ত: ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সুযোগ
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সুগন্ধি চালের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে রপ্তানির সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনায় জানানো হয়েছে, দেশের ৬১টি অনুমোদিত রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সুগন্ধি চাল বিদেশে পাঠাতে পারবে। এর আগে এই রপ্তানির সময়সীমা গত ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এই সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কঠোর শর্ত ও নতুন মূল্য নির্ধারণ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমদানি-রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে পাঠানো চিঠিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু নতুন শর্তারোপ করা হয়েছে।
ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য: এখন থেকে প্রতি কেজি সুগন্ধি চালের ন্যূনতম Export Value বা রপ্তানি মূল্য হতে হবে ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা) অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৯৫ টাকা।
বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা: গত বছরের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও Market Value যাচাই করে ১০০ থেকে ৫০০ টন পর্যন্ত রপ্তানির যে কোটা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার অতিরিক্ত চাল কোনোভাবেই রপ্তানি করা যাবে না।
হস্তান্তর অযোগ্য অনুমতি: এই রপ্তানি অনুমোদন কোনোভাবেই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরযোগ্য নয়। অর্থাৎ, কোনো প্রতিষ্ঠান নিজে রপ্তানি না করে অন্য কাউকে দিয়ে ‘সাব-কন্টাক্ট’ (Sub-contract) করাতে পারবে না।
তদারকি: প্রতিটি চালানের জাহাজিকরণের পর সংশ্লিষ্ট সকল নথিপত্র বাধ্যতামূলকভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশের সুগন্ধি চালের বৈশ্বিক সুবাস
বাংলাদেশ থেকে সাধারণভাবে চাল রপ্তানি নিষিদ্ধ থাকলেও বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে সুগন্ধি চাল রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের সুগন্ধি চালের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় এই চালের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে।
সরকারের তালিকাভুক্ত রপ্তানিযোগ্য সুগন্ধি চালের মধ্যে রয়েছে—কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, কাটারিভোগ, বাদশাভোগ, তুলসীমালা, চিনি আতপ, নাজিরশাইল (সুগন্ধি), রাঁধুনিপাগল এবং বিন্নাফুলের মতো ঐতিহ্যবাহী সব জাত।
রপ্তানির পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে মাত্র ৬৬৩ টন সুগন্ধি চাল দিয়ে এই খাতের যাত্রা শুরু হলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা ১০ হাজার ৮৭৯ টনে পৌঁছেছিল। যদিও পরবর্তীতে করোনা মহামারি ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে রপ্তানি আয়ে কিছুটা ভাটা পড়েছিল, তবে বর্তমান সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে Foreign Exchange বা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ আবারও সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা রাখে।
জটিল আইনি প্রক্রিয়া ও ছাড়পত্র
সুগন্ধি চাল রপ্তানির প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সম্পন্ন হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পাশাপাশি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ‘খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি’র সম্মতি প্রয়োজন হয়। এছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘ফাইটোস্যানিটারি সনদ’ (Phytosanitary Certificate)। এই সনদ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্য পাঠাতে পারে না, যা পণ্যের গুণগত মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিশ্চিত করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রপ্তানির মেয়াদ বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। এতে করে একদিকে যেমন কৃষকরা নায্যমূল্য পাবেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ আরও শক্তিশালী হবে।products