ইউক্রেনের রাজনীতি ও প্রশাসনিক অঙ্গনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান ‘অ্যান্টি-করাপশন ড্রাইভ’ (Anti-corruption Drive) এবার বড়সড় এক শিকার ধরল। সীমান্ত অতিক্রম করে দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টাকালে আটক হয়েছেন ইউক্রেনের সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী জার্মান গালুশচেঙ্কো। দেশটির জাতীয় দুর্নীতি দমন ব্যুরো বা ‘নাবু’ (NABU) এই চাঞ্চল্যকর আটকের খবরটি নিশ্চিত করেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
সীমান্তে শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান
স্থানীয় সময় রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ইউক্রেনের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সহায়তায় ‘নাবু’ এই অভিযান চালায়। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, আলোচিত ‘মিদাস’ (Midas) মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে সাবেক এক মন্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। যদিও নাকুর বিবৃতিতে সরাসরি গালুশচেঙ্কোর নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে গত নভেম্বর মাসে পদত্যাগ করা গালুশচেঙ্কোই যে সেই ব্যক্তি, তা নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন সূত্র। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে রাখা হয়েছে।
১০০ মিলিয়ন ডলারের ‘মানি লন্ডারিং’ কেলেঙ্কারি
জার্মান গালুশচেঙ্কোর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় দীর্ঘদিনের। ২০২৫ সালে ইউক্রেনের ‘এনার্জি সেক্টর’ (Energy Sector) বা জ্বালানি খাতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল অর্থপাচার চক্রের তথ্য ফাঁস হয়। ইউক্রেনের দুর্নীতি দমন প্রসিকিউটর কার্যালয় বা ‘সাপো’ (SAPO) দাবি করেছে, এই চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী তিমুর মিনদিচ।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মন্ত্রী থাকাকালীন গালুশচেঙ্কো তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে মিনদিচকে জ্বালানি খাতের অবৈধ ‘মানি ফ্লো’ (Money Flow) নিয়ন্ত্রণে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘এনার্জোঅ্যাটম’ (Energoatom)-এর সঙ্গে কাজ করা ঠিকাদারদের (Contractors) ওপর অঘোষিত এক প্রথা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, বকেয়া অর্থ পরিশোধ বা চুক্তি বাতিল এড়াতে ঠিকাদারদের মোট চুক্তিমূল্যের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ‘ঘুষ’ হিসেবে দিতে বাধ্য করা হতো।
জেলেনস্কি সরকারের শুদ্ধি অভিযান ও ইইউ শর্ত
এই বিশাল দুর্নীতি কেলেঙ্কারির ঢেউ আছড়ে পড়েছিল ইউক্রেনের উচ্চপদেও। এর জেরে ২০২৫ সালে আরও দুজন মন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ইউক্রেন বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (EU) যোগদানের লক্ষ্য নিয়ে কঠোর সংস্কার কর্মসূচি চালাচ্ছে। আর এই ‘মেম্বারশিপ’ পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দুর্নীতি নির্মূল করা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া টিমোশেঙ্কো এবং সাবেক প্রেসিডেন্টের এক উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গালুশচেঙ্কোর এই গ্রেপ্তার বিশ্বদরবারে ইউক্রেনের এই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বার্তাকে আরও শক্তিশালী করল। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তরা বরাবরই তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অস্বীকার করে আসছেন।