বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র রমজান। কিন্তু ত্যাগের এই মাসেও দখলদার বাহিনীর আগ্রাসন থেকে মুক্তি মিলছে না ফিলিস্তিনিদের। একদিকে যখন ধ্বংসস্তূপের মাঝেই রমজানকে বরণ করে নিতে রঙিন সাজে সাজছে গাজা উপত্যকা, অন্যদিকে তখন প্রার্থনায় আসা সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে ইসরাইল।
ধ্বংসস্তূপেই রমজানের রঙিন ছোঁয়া অবরুদ্ধ গাজাবাসী গত কয়েক মাস ধরে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। তবে আসন্ন রমজান মাস উপলক্ষে তারা ভুলে থাকতে চাইছেন সেই দুঃসহ স্মৃতি। বিধ্বস্ত ভিটেমাটি আর ধ্বংসস্তূপের মাঝেই প্রিয় উপত্যকাকে মনের মতো করে সাজিয়ে তুলেছেন তারা। বিভিন্ন রঙের আলোকসজ্জা আর সাজসজ্জায় শিশুদের মুখেও কিছুটা স্বস্তির হাসি লক্ষ্য করা গেছে। গাজাবাসীর এই মানসিক দৃঢ়তা প্রমাণ করে, শত প্রতিকূলতার মাঝেও তারা তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও উৎসবের আমেজ হারাবে না।
ড্রোনের মাধ্যমে টিয়ার গ্যাস: নতুন কৌশলে ইসরাইল তবে ফিলিস্তিনিদের এই উৎসবের মেজাজ ফিকে করে দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘চ্যানেল ১২’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পবিত্র রমজান মাসে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি ও আক্রমণ চালাতে বিশেষ ড্রোন (Drone) মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই ড্রোনগুলো দিয়ে আকাশ থেকে সাধারণ মানুষের ওপর টিয়ার গ্যাস (Tear Gas) ছোড়া হবে।
ইসরাইল কর্তৃপক্ষের দাবি, পবিত্র আল আকসা মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদে ‘অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘Crowd Control’-এর জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ইবাদত করতে আসা সাধারণ মুসুল্লিদের মনে ভীতি সঞ্চার করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। ইতিমধ্যে পশ্চিম তীরে বিশাল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী (Security Force) মোতায়েন করে নিরাপত্তা বলয় জোরদার করেছে তেল আবিব।
আল আকসায় ইবাদতে বিধিনিষেধের বেড়াজাল ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে সংঘাত শুরুর পর থেকেই জেরুজালেমে প্রবেশে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করেছে ইসরাইল। বিশেষ করে পবিত্র আল আকসা মসজিদে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে মুসলিমদের জন্য নানা বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। রমজান মাসে যখন লাখো মুসুল্লি মসজিদে জমায়েত হন, তখন এই ড্রোন মোতায়েন এবং টিয়ার গ্যাস ব্যবহারের পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রভাব: কায়রোর বাজারে উত্তাপ রমজানের প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, এর আঁচ লেগেছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। মিশরের রাজধানী কায়রোর বাজারগুলোতে নিত্যপণ্যের দাম এখন আকাশছোঁয়া। রমজানের অন্যতম অনুসঙ্গ শুকনো ফল ও বাদামের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাজারে প্রতি কেজি ‘হ্যাজেলনাট’ (Hazelnut) বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ মিশরীয় পাউন্ডে। চড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষ এখন দামি বাদামের পরিবর্তে চিনাবাদাম দিয়েই চাহিদা মেটাচ্ছেন। একই অবস্থা খেজুরেও; মানভেদে কেজি প্রতি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ পাউন্ডে।
যুদ্ধের ডামাডোল আর আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) মাঝে ফিলিস্তিনি ও মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের জন্য এবারের রমজান যেন এক অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে দখলদার বাহিনীর অস্ত্রের ঝনঝনানি, অন্যদিকে জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়—সব মিলিয়ে এক বিষণ্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সিয়াম সাধনার প্রস্তুতি নিচ্ছে এই জনপদ।