বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে জমকালো আসর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে (Premier League) আবারও দেখা যাবে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক অনন্য নজির। পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে মুসলিম ফুটবলারদের রোজা ভাঙার সুবিধার্থে ম্যাচ চলাকালীন বিশেষ বিরতির ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে প্রিমিয়ার লিগ ও ইংলিশ ফুটবল লিগ (EFL) কর্তৃপক্ষ। গত কয়েক মৌসুমের ধারাবাহিকতায় এবারও মাঠের লড়াইয়ের মাঝেই রোজাদার খেলোয়াড়দের জন্য ইফতারের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
ধর্মীয় অনুশাসন ও আধুনিক ফুটবলের মেলবন্ধন চলতি সপ্তাহ থেকেই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, এই এক মাস সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা। তবে পেশাদার ফুটবলের চরম শারীরিক ধকলের মধ্যেও অনেক ফুটবলার রোজা পালন করেন। যুক্তরাজ্যে বর্তমানে সূর্যাস্ত হয় সন্ধ্যা ৫টা থেকে ৭টার মধ্যে। ফলে যেসব ম্যাচের ‘Kick-off’ বা শুরু হওয়ার সময় বিকাল সাড়ে ৫টা বা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়, সেই ম্যাচগুলোর চলাকালীনই ইফতারের সময় হয়ে যায়। খেলোয়াড়রা যাতে মাঠেই দ্রুত রোজা ভেঙে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই বিশেষ উদ্যোগ।
কীভাবে কার্যকর হবে এই ‘ইফতার বিরতি’? লিগ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, ম্যাচের আগে সংশ্লিষ্ট দুই দলের ‘Captain’ এবং ‘Match Officials’ বা রেফারিরা আলোচনা করে এই বিরতির সময় নির্ধারণ করবেন। তবে এই বিরতিটি কোনোভাবেই ‘Tactical Timeout’ বা কৌশলগত বিরতি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। খেলা চলাকালীন হঠাৎ করে কোনো বাঁশি বাজিয়ে বিরতি দেওয়া হবে না; বরং ‘Dead Ball’ সিচুয়েশন অর্থাৎ গোল-কিক (Goal-kick), ফ্রি-কিক কিংবা থ্রো-ইনের মতো সুবিধাজনক মুহূর্তে স্বল্প সময়ের জন্য খেলা থামানো হবে। সেই সুযোগে মুসলিম খেলোয়াড় বা ম্যাচ কর্মকর্তারা তরল খাবার বা ‘Energy Gel’ গ্রহণ করে রোজা ভাঙতে পারবেন।
২০২১ সালের সেই ঐতিহাসিক মাইলফলক প্রিমিয়ার লিগে আনুষ্ঠানিকভাবে ইফতারের বিরতি দেওয়ার প্রথা শুরু হয় ২০২১ সালে। সে বছরের এপ্রিলে লেস্টার সিটি বনাম ক্রিস্টাল প্যালেস ম্যাচে প্রথমবার এই দৃশ্য দেখা যায়। ম্যাচের প্রায় ৩০ মিনিটের মাথায় এক গোল-কিকের সময় খেলা থামানো হয়েছিল, যাতে লেস্টারের ডিফেন্ডার ওয়েসলি ফোফানা এবং প্যালেসের শেখু কুয়াতে ইফতার করতে পারেন। এরপর থেকে ইউরোপীয় ফুটবলে এটি একটি স্বীকৃত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
তারকাদের মুখপত্র ও ক্লাবের সহযোগিতা বর্তমান প্রিমিয়ার লিগে মোহামেদ সালাহ, উইলিয়াম সালিবা, র্যান আইত-নৌরি এবং আমাদ দিয়ালোর মতো অসংখ্য মুসলিম সুপারস্টার খেলছেন। সাবেক এভারটন মিডফিল্ডার আব্দুলায়ে ডুকুরে একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘প্রিমিয়ার লিগে আপনি আপনার ধর্ম পালনের জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন। আমাদের বিশ্বাসের প্রতি লিগ কর্তৃপক্ষের এই সম্মান সত্যিই অসাধারণ।’ তিনি আরও জানান, ক্লাবগুলোতে মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য ‘Halal Food’-এর বিশেষ ব্যবস্থা থাকে এবং শেফরা রোজাদারদের চাহিদা অনুযায়ী খাবার প্রস্তুত করেন।
শুধু মাঠের বিরতিই নয়, রমজানে ফুটবলারদের শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে লিভারপুলের মতো বড় ক্লাবগুলো তাদের ‘Training Schedule’ বা অনুশীলনের সময়সূচিতেও পরিবর্তন আনে। সাবেক লিভারপুল তারকা সাদিও মানে জানিয়েছিলেন, রমজানে ভোরে অনুশীলন করার ব্যবস্থা করে ক্লাব কর্তৃপক্ষ খেলোয়াড়দের সহায়তায় এগিয়ে আসে।
ইউরোপীয় ফুটবলের এই পেশাদারিত্ব এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, খেলাধুলা কেবল জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, বরং তা বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শনেরও এক বড় মাধ্যম।