বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক ধূমকেতুর মতো, যার তেজ আর দীপ্তিতে কয়েক দশক আলোকিত ছিল ঢালিউড। আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি, বাংলা সিনেমার অন্যতম প্রভাবশালী মেগাস্টার নায়ক মান্নার প্রয়াণ দিবস। ২০০৮ সালের এই বিষাদময় দিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই দাপুটে অভিনেতা। সময়ের হিসেবে প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও, সাধারণ মানুষের কাছে ‘মান্না’ নামটি আজও এক আবেগের নাম, এক অপরাজেয় সংগ্রামের প্রতীক।
আসলাম তালুকদার থেকে রুপালি পর্দার ‘মান্না’ টাঙ্গাইলের কালিহাতীর এলেঙ্গার সাধারণ এক কিশোর সৈয়দ মোহাম্মদ আসলাম তালুকদার। চোখে ছিল আকাশছোঁয়া স্বপ্ন আর বুকভরা আত্মবিশ্বাস। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (BFDC) আয়োজিত ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ঘটে। শুরুর পথচলা খুব একটা মসৃণ না হলেও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ‘কাসেম মালার প্রেম’ সিনেমার আকাশচুম্বী সাফল্য তাঁকে এনে দেয় অভাবনীয় পরিচিতি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একে একে অভিনয় করেন তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে।
প্রতিবাদের ভাষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সিনেমা মান্না কেবল একজন রোমান্টিক নায়ক ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমাজের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি। ‘দাঙ্গা’, ‘ত্রাস’, ‘লুটতরাজ’, ‘তেজী’ কিংবা ‘আম্মাজান’—প্রতিটি সিনেমাতে তাঁর উপস্থিতি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার গর্জন। বিশেষ করে ‘আম্মাজান’ সিনেমাটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। তাঁর সংলাপ দেওয়ার স্বতন্ত্র ভঙ্গি এবং চোখের তীক্ষ্ণ চাহনি দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। তিনি পর্দার আড়ালে থেকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন যে, প্রতিটি পরিবারে তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন অতি আপনজন।
ইন্ডাস্ট্রির ত্রাণকর্তা ও সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নব্বই দশকের শেষভাগে যখন বাংলা সিনেমা অশ্লীলতার কালো থাবায় বিপন্ন হতে বসেছিল, তখন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মান্না। তিনি কেবল একজন ব্যস্ত অভিনেতাই ছিলেন না, ছিলেন দূরদর্শী একজন প্রযোজকও। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্র’ থেকে তিনি মানসম্মত এবং সামাজিক সচেতনতামূলক সিনেমা উপহার দিয়ে দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে এনেছিলেন। ইন্ডাস্ট্রির দুঃসময়ে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আজও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কাছে উদাহরণ হয়ে আছে।
পুরস্কার ও কালজয়ী উত্তরাধিকার অভিনয় জীবনে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল আপামর জনসাধারণের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আজও গ্রাম-বাংলার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহরের ডিজিটাল স্ক্রিন—সবখানেই মান্নার সিনেমা মানেই অন্যরকম উন্মাদনা। নতুন প্রজন্মের কাছেও মান্না এক অনুপ্রেরণার নাম, যার অভিনয়ের ধরন ছিল সমসাময়িক বাস্তবতার প্রতিফলন।
টাঙ্গাইলের পারিবারিক কবরস্থানে মহানায়ক আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। শরীরী প্রস্থান ঘটলেও তাঁর সৃষ্টিকর্ম, তাঁর কালজয়ী সংলাপ এবং চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর নিবেদন তাঁকে অমর করে রেখেছে। মান্না ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—বাঙালি দর্শক হৃদয়ের মণিকোঠায়।