তেহরান, ১৮ ফেব্রুয়ারি: বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বরফ গলার ইঙ্গিত মিলছিল, ঠিক তখনই নতুন সমীকরণের বার্তা দিল ইরান। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাশিয়ার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ওমান উপসাগরে বড়সড় এক সামরিক মহড়ার ডাক দিয়েছে ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হতে যাওয়া এই মহড়াকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
মস্কো-তেহরান অক্ষ: ওমান উপসাগরে রণসজ্জা
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘আইএসএনএ’ (ISNA) জানিয়েছে, রাশিয়ার নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ওমান উপসাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় এই ‘যৌথ নৌ-মহড়া’ পরিচালিত হবে। সামরিক মুখপাত্র হাসান মাকসুদলু এই মহড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এর মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা (Maritime Security) জোরদার করা এবং দুই বন্ধুরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর মধ্যে পেশাদার সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী স্তরে নিয়ে যাওয়া। যদিও এই ‘জয়েন্ট ড্রিল’ কতদিন স্থায়ী হবে, সে বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।
হরমুজ প্রণালীতে টানটান উত্তেজনা
রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়ার পাশাপাশি ইরান নিজস্ব শক্তিমত্তার মহড়াও চালিয়ে যাচ্ছে। গত সোমবার থেকেই ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি (IRGC)-এর তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালীতে একটি পৃথক সামরিক মহড়া শুরু হয়েছে। বিশ্ববাজারে খনিজ তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য এই প্রণালীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ (Global Energy Route)। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ইরানি শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার এই পথটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। মঙ্গলবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত অজুহাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য এই রুটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আলোচনা বনাম রণপ্রস্তুতি: ওয়াশিংটন-তেহরান স্নায়ুযুদ্ধ
এই সামরিক মহড়ার ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো যখন ওমানের মধ্যস্থতায় ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, গত জুন মাসে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল দুই পক্ষের প্রথম আনুষ্ঠানিক সংলাপের প্রয়াস। সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে (Nuclear Sites) অংশ নিয়েছিল, যার পাল্টা জবাবে তেহরানও এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তেহরান বলছে, তাদের এই আলোচনা কেবলমাত্র ‘নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম’ বা পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরেই সীমাবদ্ধ। তবে মার্কিন প্রশাসন চাইছে, আলোচনার পরিসর আরও বৃদ্ধি করে ইরানের ‘ব্যালিস্টিক মিসাইল’ (Ballistic Missile) কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি তেহরানের সমর্থন বা ‘প্রক্সি ওয়ার’ (Proxy War) নিয়েও সমাধান সূত্র বের করতে।
পেন্টাগনের সতর্ক নজর
ইরানের এই দ্বিমুখী নীতির প্রতিক্রিয়ায় পেন্টাগনও বসে নেই। উপসাগরীয় জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তাদের বিশাল নৌবহর বা ‘ফ্লিট’ (US Fleet) মোতায়েন করে রেখেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক হস্তক্ষেপের যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, এই মোতায়েন তারই অংশ।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিল আর অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া—ইরানের এই ‘স্ট্র্যাটেজিক’ চালকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন দর কষাকষির (Bargaining Chip) একটি বড় অস্ত্র হিসেবে। ক্রেমলিনের সঙ্গে ইরানের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সখ্যতা পশ্চিমাদের ওপর কতটা চাপ তৈরি করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।