বিকেলের আড্ডায় এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে মুড়ি মাখা কিংবা রাস্তার ধারের ঝালমুড়ি—বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মুড়ি মিশে আছে ওতপ্রোতভাবে। তবে সাধারণ এই খাবারটি কেবল স্বাদের জন্যই নয়, বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অসাধারণ সব ওষুধি গুণ। অনেক সময় দামী সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধের বিকল্প হিসেবেও কাজ করতে পারে এক মুঠো মুড়ি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে মুড়ির স্বাস্থ্যগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম বা ‘Metabolism’ সচল রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।
গ্যাস্ট্রিকের যম এই ‘ম্যাজিক’ খাবার
বর্তমান সময়ে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে ‘Gastric problem’ বা অ্যাসিডিটি প্রায় ঘরে ঘরে। চিকিৎসকদের মতে, মুড়ি খেলে পেটে অ্যাসিডের ক্ষরণে (Acid secretion) ভারসাম্য আসে। যারা তীব্র গ্যাসের সমস্যায় ভোগেন, তারা নিয়মিত মুড়ি খেলে আরাম পেতে পারেন। বিশেষ করে খুব বেশি অ্যাসিডিটি হলে মুড়ি পানিতে ভিজিয়ে খাওয়ার প্রাচীন ঘরোয়া টোটকাটি বৈজ্ঞানিকভাবেও স্বীকৃত, কারণ এটি দ্রুত বুক জ্বালাপোড়া কমিয়ে প্রশান্তি দেয়।
হাড় ও দাঁতের মজবুত গঠন
মুড়িতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম (Calcium) এবং আয়রন (Iron)। হাড়ের ক্ষয়রোধ এবং দাঁতের এনামেল রক্ষায় এই দুটি উপাদান অপরিহার্য। এছাড়া মুড়ি চিবিয়ে খাওয়ার ফলে দাঁত ও মাড়ির এক ধরণের প্রাকৃতিক ব্যায়াম হয়, যা মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য উন্নত করে। নিয়মিত মুড়ি খাওয়া হাড়ের দীর্ঘমেয়াদী রোগ বা অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
ওজন কমাতে মোক্ষম দাওয়াই
যারা ওজন কমানোর জন্য ‘Low calorie diet’ অনুসরণ করছেন, তাদের জন্য মুড়ি একটি আদর্শ স্ন্যাকস হতে পারে। মুড়িতে ক্যালোরির মাত্রা অত্যন্ত কম হলেও এটি দ্রুত পেট ভরিয়ে দেয়। দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি হয় বলে বারবার খাওয়ার প্রবণতা কমে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। জাঙ্ক ফুডের পরিবর্তে হালকা খাবার হিসেবে মুড়ি বেছে নেওয়া একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারার (Healthy Lifestyle) প্রতিফলন।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সোডিয়ামের সঠিক মাত্রা
উচ্চ রক্তচাপ বা ‘High Blood Pressure’ রোগীদের জন্য লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। মুড়িতে সোডিয়ামের মাত্রা অত্যন্ত নগণ্য। ফলে এটি খাওয়ার পর রক্তচাপ বাড়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না। হৃদরোগীদের ক্ষেত্রেও মুড়ি একটি নিরাপদ খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিভাবে খেলে মিলবে সর্বোচ্চ পুষ্টি?
মুড়ি খাওয়ার পুষ্টিগুণ আরও বাড়িয়ে তোলা সম্ভব যদি এটি সঠিক উপায়ে খাওয়া হয়।
সবজির মিশ্রণ: মুড়ির সঙ্গে শসা, পেঁয়াজ, টমেটো এবং ধনেপাতা মিশিয়ে খেলে ভিটামিন ও মিনারেলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
প্রোটিন সংযোজন: সেদ্ধ ছোলা বা রোস্ট করা বাদাম যোগ করলে মুড়ি একটি ‘High Protein’ খাবারে পরিণত হয়।
তেল এড়িয়ে চলা: অতিরিক্ত তেল, কৃত্রিম চাটনি বা অতিরিক্ত ঝাল এড়িয়ে চললে মুড়ির প্রকৃত উপকারিতা পাওয়া যায়।
সতর্কতা: ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
মুড়ি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হলেও ডায়াবেটিস (Diabetes) রোগীদের ক্ষেত্রে কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। মুড়ির ‘Glycemic Index’ কিছুটা বেশি হওয়ায় এটি দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।