মাঝেমধ্যে জনসমক্ষে বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো মিটিংয়ের মাঝে হুট করে হেঁচকি ওঠা কেবল বিড়ম্বনারই নয়, বরং বেশ বিব্রতকরও বটে। সাধারণত আমরা হেঁচকি শুরু হলেই ঢকঢক করে পানি খাওয়া শুরু করি। কিন্তু অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি পানের পরও এই সমস্যার সমাধান হয় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, হেঁচকি হলো মূলত আমাদের ‘ডায়াফ্রাম’ (Diaphragm) পেশির আকস্মিক সংকোচন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত দ্রুত খাবার গ্রহণ কিংবা গরম খাবারের সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা পানীয় পান করলে এই সমস্যার সূত্রপাত হয়। তবে পানি ছাড়াও এমন কিছু কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রয়েছে, যা দ্রুত হেঁচকি থামাতে সক্ষম।
১. শ্বাস ধরে রাখার কৌশল (Breath-Holding Technique) হেঁচকি থামাতে সবচেয়ে প্রাচীন এবং কার্যকর পদ্ধতি হলো লম্বা শ্বাস নিয়ে তা ভেতরে আটকে রাখা। এই পদ্ধতিতে নাক ও মুখ বন্ধ করে যতক্ষণ সম্ভব শ্বাস ধরে রাখুন। যখন কষ্ট অসহ্য পর্যায়ে চলে আসবে, তখন খুব ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এতে শরীরের রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা সামান্য বেড়ে যায়, যা ডায়াফ্রাম পেশিকে শান্ত করতে এবং হেঁচকি থামাতে সাহায্য করে।
২. আকস্মিক স্নায়বিক উত্তেজনা বা ‘ভয়’ শুনতে অবাক লাগলেও, হঠাৎ কোনো বিষয় দেখে ভয় পাওয়া বা আতঙ্কিত হওয়া হেঁচকি থামানোর একটি মনস্তাত্ত্বিক উপায়। হঠাৎ ভয়ের কারণে মানুষের স্নায়ু বা ‘Nerve’ উদ্দীপিত হয়, যা মস্তিষ্কের মনোযোগ সরিয়ে নেয়। ফলে ডায়াফ্রামের অনৈচ্ছিক সংকোচন বা হেঁচকি মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
৩. কান ও নাক বন্ধের যৌথ পদ্ধতি দুই কানের ছিদ্রে আঙুল ঢুকিয়ে এবং একই সঙ্গে নাক চেপে ধরে শ্বাস বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন। এই প্রক্রিয়ায় শরীরে বায়ুচাপের পরিবর্তন ঘটে এবং ভেগাস নার্ভ (Vagus Nerve) উদ্দীপিত হয়, যা দ্রুত হেঁচকি প্রশমনে ভূমিকা রাখে।
৪. মাখন ও চিনির ঘরোয়া দাওয়াই যদি বাড়িতে মাখন এবং চিনি থাকে, তবে এক চামচ মাখনের সঙ্গে সামান্য চিনি মিশিয়ে মুখে নিন। এই মিশ্রণের বিশেষ গঠন এবং স্বাদ গলার ভেতরের স্নায়ুগুলোকে নতুন সংকেত পাঠায়, যার ফলে হেঁচকি বন্ধ হয়।
৫. অ্যান্টাসিড ট্যাবলেটের ভূমিকা (Antacid Tablet) দ্রুত হেঁচকি থামাতে অনেক সময় চিকিৎসকরা ‘Antacid’ ট্যাবলেট চুষে খাওয়ার পরামর্শ দেন। এই ট্যাবলেটে থাকা প্রচুর পরিমাণ ম্যাগনেশিয়াম (Magnesium) শরীরের পেশি ও নার্ভগুলোকে দ্রুত শান্ত করতে কার্যকর। বিশেষ করে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার কারণে হেঁচকি উঠলে এটি জাদুর মতো কাজ করে।
৬. লেবুর টক স্বাদের জাদুকরী প্রভাব হেঁচকি ওঠার সময় এক টুকরো লেবু মুখে নিয়ে চুষতে পারেন। লেবুর তীব্র টক স্বাদ মুখের ভেতরে থাকা ডায়াফ্রাম পেশিগুলোকে উত্তেজিত করে এবং মস্তিষ্কের হেঁচকি তৈরির সংকেতকে বাধাগ্রস্ত করে। এতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অস্বস্তিকর হেঁচকি থেমে যায়।
৭. বরফ কুচির শীতল থেরাপি ছোট এক টুকরো বরফ মুখে নিয়ে তা গলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। বরফ গলে যাওয়া ঠান্ডা পানি ধীরে ধীরে গিলে ফেললে তা অন্ননালীর স্নায়ুগুলোকে শীতল করে এবং ডায়াফ্রামের স্পন্দনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
পরিশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, সাধারণ হেঁচকি এই ঘরোয়া পদ্ধতিগুলোতেই সেরে যায়। তবে যদি কারো টানা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন ধরে হেঁচকি উঠতে থাকে, তবে সেটিকে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ এটি অনেক সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ অন্য কোনো জটিল সমস্যার সংকেতও হতে পারে।