দৈনন্দিন জীবনে অনেক সময় আমরা হাত-পায়ে অস্বস্তিকর জ্বালাপোড়া বা হঠাৎ সুচ ফোটার মতো (Tingling Sensation) অনুভূতির সম্মুখীন হই। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় 'পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি' (Peripheral Neuropathy) বলা হয়। প্রাথমিকভাবে একে সাধারণ ক্লান্তি মনে করা হলেও, এটি আসলে শরীরে বিশেষ কিছু ভিটামিনের ঘাটতির একটি শক্তিশালী 'Biological Signal'। দীর্ঘ সময় ধরে এই উপসর্গগুলো অবহেলা করলে স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পাঠকদের জন্য শরীরের এই বিশেষ বিড়ম্বনার নেপথ্যে থাকা ভিটামিনগুলোর ভূমিকা ও সতর্কবার্তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ভিটামিন বি-১২ (Vitamin B12): স্নায়ুর সুরক্ষা কবচ হাত-পা জ্বালাপোড়ার প্রধান এবং অন্যতম কারণ হলো ভিটামিন বি-১২-এর অভাব। এই ভিটামিন স্নায়ুর ওপরের বিশেষ আবরণ 'মাইলিন' (Myelin) তৈরিতে এবং তা রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরে বি-১২-এর ঘাটতি দেখা দিলে মাইলিন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে স্নায়বিক সংকেত প্রবাহে বিঘ্ন ঘটে। এর ফলে হাত-পায়ে ঝিনঝিন করা, অবশ ভাব, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং চরম দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে নিরামিষাশী এবং বয়স্কদের মধ্যে এই 'Deficiency' বেশি দেখা যায়।
২. ভিটামিন বি-৬ (Vitamin B6): ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা স্নায়বিক স্বাস্থ্যের জন্য ভিটামিন বি-৬ বা পাইরিডক্সিন অত্যন্ত জরুরি। এটি শরীরের নিউরোট্রান্সমিটার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এই ভিটামিনের অভাবে হাতে-পায়ে জ্বালাপোড়া এবং খিঁচুনি হতে পারে। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম সতর্কতা রয়েছে—শরীরে অতিরিক্ত বি-৬ জমা হলেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
৩. ভিটামিন বি-১ (Vitamin B1): স্নায়ুর শক্তির উৎস ভিটামিন বি-১ বা থায়ামিন স্নায়ু কোষের শক্তি বিপাক প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত। এর তীব্র অভাবে 'বেরিবেরি' নামক রোগ হতে পারে, যার অন্যতম লক্ষণ হলো হাত-পায় তীব্র জ্বালা এবং হাঁটাচলায় ভারসাম্যহীনতা। যারা নিয়মিত অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস বা দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ভিটামিনের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে।
৪. ভিটামিন ডি (Vitamin D): হাড় ও পেশির সমন্বয় যদিও ভিটামিন ডি সরাসরি স্নায়ুর জ্বালাপোড়া তৈরি করে না, তবে এটি শরীরের ক্যালসিয়াম শোষণ এবং পেশি ও হাড়ের গঠনে অপরিহার্য। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হলে পেশিতে দুর্বলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা শুরু হয়, যা স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে শরীরে এক ধরনের সার্বিক অস্বস্তি ও জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে।
কখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন? শরীরের এই সংকেতগুলোকে সাধারণ মনে করে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। যদি নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে দ্রুত 'Medical Checkup' করানো জরুরি:
যদি জ্বালাপোড়ার অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং রাতে ঘুমানোর সময় বৃদ্ধি পায়।
যদি আপনার আগে থেকেই ডায়াবেটিস (Diabetes) থাকে, কারণ উচ্চ রক্তচাপ বা 'Blood Sugar' স্নায়ুর ক্ষতি করতে পারে।
হাত বা পা হঠাৎ অবশ হয়ে যাওয়া বা মাংসপেশির নিয়ন্ত্রণ হারানো।
শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে কষ্ট হওয়া বা হাঁটাচলায় সমস্যা।
সুস্থ জীবনযাপনের জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং সঠিক পুষ্টির বিকল্প নেই। হাত-পায়ের এই ছোটখাটো উপসর্গগুলো আসলে শরীরের এক ধরনের 'Warning System', যা সময়মতো শনাক্ত করলে বড় ধরনের স্নায়বিক জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।