বাঙালি রান্নাঘরে টমেটো ছাড়া যেন রান্নার স্বাদই পূর্ণতা পায় না। সালাদ থেকে শুরু করে তরকারি, এমনকি শেষ পাতে চাটনি—সবখানেই টমেটোর সরব উপস্থিতি। তবে কেবল রান্নার অনুষঙ্গ হিসেবে নয়, পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে টমেটো একটি প্রকৃত ‘সুপারফুড’ (Superfood)। লাল কিংবা সবুজ, যে অবস্থাতেই হোক না কেন, টমেটোর মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন কিছু জাদুকরী গুণ যা আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার নানা জটিল রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে। গবেষণায় প্রমাণিত টমেটোর এমনই আটটি অনন্য গুণ নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।
১. ওজন নিয়ন্ত্রণে ‘লো-ক্যালোরি’ ম্যাজিক যারা ডায়েট (Diet) বা ওজন কমানোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য টমেটো এক আদর্শ খাবার। প্রতি ১০০ গ্রাম টমেটোতে ক্যালোরির পরিমাণ মাত্র ১৮ গ্রাম। এতে চর্বির পরিমাণ নেই বললেই চলে, ফলে এটি শরীরের মেদ কমাতে অত্যন্ত সহায়ক।
২. ভিটামিনের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার টমেটোকে ভিটামিনের পাওয়ার হাউস বলা যেতে পারে। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি (Vitamin C), যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম (Immune System) শক্তিশালী করে। এছাড়া হাড়ের সুরক্ষায় ভিটামিন কে, দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে ভিটামিন এ এবং মেটাবলিজম উন্নত করতে ভিটামিন বি-৬ এর এক অনন্য সমন্বয় রয়েছে এতে।
৩. লাইকোপিনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সুরক্ষা টমেটোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হলো লাইকোপিন (Lycopene)। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (Antioxidant), যা শরীরের কোষগুলোকে ফ্রি-র্যাডিক্যালের হাত থেকে রক্ষা করে। একাধিক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত টমেটো খেলে প্রোস্টেট, ফুসফুস ও পাকস্থলীর ক্যানসার প্রতিরোধের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।
৪. হার্ট ও মাংসপেশির সুরক্ষায় মিনারেলস টমেটোতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজ থাকে। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া নিয়মিত টমেটো খেলে শরীরের মাংসপেশির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং ক্লান্তি দূর হয়।
৫. প্রাকৃতিকভাবে শরীর ‘ডিটক্স’ ও হাইড্রেশন টমেটোতে প্রায় ৯৪ শতাংশই পানি। দীর্ঘক্ষণ শরীরকে আর্দ্র বা হাইড্রেটেড (Hydrated) রাখতে এর জুড়ি নেই। উচ্চ জলীয় উপাদানের কারণে এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করে দিতে বা ডিটক্স (Detox) করতে সাহায্য করে।
৬. হজমশক্তি ও ফাইবার টমেটো প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক আঁশ বা ফাইবার (Fiber) সমৃদ্ধ। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। যারা নিয়মিত পেটের সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য কাঁচা টমেটোর সালাদ অত্যন্ত উপকারী।
৭. উজ্জ্বল ত্বক ও ঝলমলে চুল টমেটোতে থাকা ভিটামিন এ কেবল দৃষ্টিশক্তিই বাড়ায় না, এটি চুলের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিতেও জাদুকরী ভূমিকা রাখে। এছাড়া ত্বকের কোলাজেন (Collagen) বৃদ্ধিতে ভিটামিন সি সাহায্য করে, যা বলিরেখা দূর করে ত্বককে সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখে। স্কিন কেয়ার (Skin Care) রুটিনে তাই টমেটোর নির্যাস বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
৮. কিডনি পাথরের ঝুঁকি হ্রাস একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে টমেটোর বীজ ক্ষতিকর, তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। দেখা গেছে, বীজসহ টমেটো খেলে তা কিডনিতে পাথর (Kidney Stone) হওয়ার আশঙ্কা কমিয়ে দেয়। এটি কিডনির ফিল্টারিং ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
প্রকৃতির এই অনন্য দান কেবল একটি সবজি বা ফল নয়, এটি আপনার প্রতিদিনের ওষুধের বিকল্প হিসেবেও কাজ করতে পারে। তাই সুস্থ ও দীর্ঘায়ু পেতে নিয়মিত খাদ্যতালিকায় টমেটো রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন পুষ্টিবিদরা।