নদীমাতৃক বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। দেশের ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, ন্যায্য পানিবণ্টন নিশ্চিত করা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এখন থেকে প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক—উভয় স্তরেই জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার ময়নামতি চর এলাকায় করতোয়া নদীর ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।
কূটনৈতিক সংলাপ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের মোট ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে ৫৪টির উৎস ও প্রবাহ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে এবং বাকি ৩টি নদী মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত। এই নদীগুলোর পানিবণ্টন (Water Sharing) এবং নাব্যতা রক্ষা করা বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশের জন্য জীবন-মরণ সমস্যা। তিনি বলেন, "অতীতের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধানে আমরা গঠনমূলক সংলাপ বা Constructive Dialogue-এর ওপর জোর দিচ্ছি। এরই মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং কারিগরি ও কূটনৈতিক পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তথ্য বিশ্লেষণ (Data Analysis) চলমান রয়েছে।"
মরুকরণ রোধে বিশেষ নজর উত্তরাঞ্চলের নদী ও কৃষিনির্ভর জনপদকে মরুকরণ (Desertification) থেকে রক্ষা করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, "আমাদের লক্ষ্য সুজলা-সুফলা বাংলাদেশকে তার পুরনো রূপে ধরে রাখা। নদীগুলোর নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ার ফলে পরিবেশের যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারে আমরা কাজ করছি। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বজায় রাখা এবং বর্ষায় ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।"
ইশতেহার বাস্তবায়ন ও নদী খনন কর্মসূচি করতোয়া নদীর বিভিন্ন অংশ পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সারা দেশের নদী, খাল ও জলাশয় পুনরায় খনন করে সেগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি বলেন, "নদী খনন বা Dredging কেবল নৌ-চলাচলের জন্য নয়, বরং সেচ সুবিধা এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখার জন্য অপরিহার্য। উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু হওয়া এই খনন কার্যক্রম অতি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে।"
মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়ন পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) মাহমুদুল হাসান এবং পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (WDB) নির্বাহী প্রকৌশলী আশুতোষ রায়। কর্মকর্তারা নদী ভাঙন রোধে চলমান জিও-ব্যাগ ডাম্পিং এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কারিগরি দিকগুলো প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। ফরহাদ হোসেন আজাদ স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই পরিদর্শন কার্যক্রমে অংশ নেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারের এই সময়োপযোগী কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা সঠিক পথে চললে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদী পানি নিরাপত্তা (Water Security) নিশ্চিত হবে।