মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে এবার ইসরাইল উপকূলে নোঙর করেছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’ (USS Gerald R. Ford)। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে ধারণা করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
রণতরি মোতায়েন ও যুদ্ধের আবহ ইসরাইলি চ্যানেল ১২ এবং টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, শুক্রবার সকালে রণতরি জেরাল্ড আর. ফোর্ড ইসরাইল উপকূলে তার Strategic Deployment সম্পন্ন করেছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি, তবে এই শক্তিশালী রণতরির উপস্থিতি ওই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতির সংকেত দিচ্ছে। মূলত ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম বন্ধে চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
আকাশপথে বড় হামলার প্রস্তুতি? কেবল সমুদ্রপথে নয়, আকাশপথেও সামরিক শক্তি কয়েকগুণ বৃদ্ধি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক ডজন অত্যাধুনিক Stealth Fighter এবং বোমারু বিমান ইতোমধ্যে ইসরাইলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুদ্ধবিমানগুলোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহকারী বা Refueling বিমানও পাঠানো হয়েছে। এই পদক্ষেপটি মূলত দূরপাল্লার মিশনে যুদ্ধবিমানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নেওয়া হয়, যা ইরানের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য নিখুঁত হামলার (Precision Strike) ইঙ্গিতবাহী।
কূটনৈতিক প্রস্থান ও বৈশ্বিক উদ্বেগ পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাওয়ায় দেশ ছাড়ার হিড়িক পড়েছে। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক জরুরি ইমেইল বার্তায় দূতাবাস কর্মীদের এবং তাদের পরিবারকে ‘আজই’ ইসরাইল ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরে থাকা নিজেদের নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক করে দিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে চীনা নাগরিকদের দ্রুত ইরান ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ মোট ৯টি দেশ তাদের নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত অঞ্চল ছাড়ার আনুষ্ঠানিক বার্তা দিয়েছে।
উড়োজাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যিক প্রভাব নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে (Security Concerns) আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোও তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা কেএলএম (KLM) আমস্টারডাম থেকে তেল আবিবে তাদের সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোও একইভাবে ফ্লাইট বাতিল বা রুট পরিবর্তনের কথা ভাবছে, যা ওই অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের স্থবিরতা সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি ও ইরানের অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসন বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রোধে তারা প্রয়োজনে ‘সর্বোচ্চ শক্তি’ প্রয়োগ করবে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় কাজ না হলে সামরিক পদক্ষেপই হবে একমাত্র বিকল্প। এর বিপরীতে তেহরানও তাদের অনড় অবস্থান ঘোষণা করেছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ বা সামরিক হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তারা শর্ত দিয়েছে যে, পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়ার বিষয়টি অবশ্যই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা Sanctions প্রত্যাহারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে হবে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি ছোট স্ফুলিঙ্গ বড় ধরনের আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।