দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত সংঘাত এখন যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তাদের ধারাবাহিক Military Operation-এ এখন পর্যন্ত ২৭৪ জন তালেবান সেনা ও সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছে। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ইসলামাবাদে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হয়।
পাক সেনাবাহিনীর বিধ্বংসী অভিযানের খতিয়ান পাকিস্তানের আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (ISPR) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে জানান, সীমান্ত রক্ষায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, অভিযানে কেবল ২৭৪ জন তালেবান সদস্য নিহতই হয়নি, বরং আহত হয়েছে ৪ শতাধিক আফগান সেনা। এছাড়া আফগান বাহিনীর ৭৩টি সামরিক চৌকি পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে এবং ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ চৌকির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে পাক বাহিনী।
জেনারেল আহমেদ শরীফ আরও উল্লেখ করেন, "আমাদের প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী, আফগান বাহিনীর অন্তত ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং ভারী কামান ধ্বংস করা হয়েছে। এটি আফগান সামরিক অবকাঠামোর ওপর একটি বড় ধরনের আঘাত।" তবে এই সংঘাতে পাকিস্তানেরও ১২ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে তিনি নিশ্চিত করেন। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরাসরি নির্দেশে এই অপারেশন অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আফগানিস্তানের হুঁশিয়ারি: ‘আমাদের হাত তাদের গলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে’ ইসলামাবাদের এই দাবির কয়েক ঘণ্টা পরেই কাবুলে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন আফগান সরকারের মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ। তিনি পাকিস্তানের দাবিকৃত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও ইসলামাবাদের প্রতি চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। মুজাহিদ দাবি করেন, পাকিস্তান বারবার যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানিয়েছিল, কিন্তু সীমান্ত আগ্রাসন তারা থামায়নি।
তিনি বলেন, "আমরা সংলাপের মাধ্যমে সমাধান চাই। কিন্তু পাকিস্তান যদি হামলা চালিয়ে যেতে থাকে, তবে তার কঠোর জবাব দেওয়ার পূর্ণ সামর্থ্য আমাদের আছে। আমরা পাকিস্তানের অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু Strategic Target বা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছি। এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে—আমাদের হাত তাদের গলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।"
টিটিপি ইস্যু ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP) আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। তবে জবিহুল্লাহ মুজাহিদ এই অভিযোগকে ‘পূর্বপরিকল্পিত অজুহাত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, টিটিপি পাকিস্তানের একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং আফগানিস্তানকে এর বলির পাঁঠা বানানো যাবে না।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রসঙ্গ টেনে মুজাহিদ বলেন, "ভারতের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে, যা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌম অধিকার। তবে আমাদের এই বন্ধুত্ব কখনোই পাকিস্তানের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নয়।"
সীমান্তের এই অস্থিতিশীলতা কেবল দুই প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি হুংকার ও Military Engagement দ্রুত প্রশমিত না হলে তা দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।