দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর শরীর যখন ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে, তখন ইফতারে এমন কিছু প্রয়োজন যা দ্রুত পুষ্টি ও শক্তি ফিরিয়ে দিতে পারে। প্রথাগত শরবতের ভিড়ে বর্তমানে স্বাস্থ্যসচেতনদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘খেজুরের স্মুদি’ (Date Smoothie)। কেবল স্বাদেই নয়, পুষ্টিগুণে ভরপুর এই পানীয়টি ইফতারের জন্য একটি ‘Complete Meal’ হিসেবে কাজ করে। কেন পুষ্টিবিদরা ইফতারে খেজুরের স্মুদিকে সেরা পানীয় হিসেবে গণ্য করছেন, তার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ।
তাৎক্ষণিক শক্তি ও শর্করা নিয়ন্ত্রণ খেজুরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক চিনি যেমন গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ ও সুক্রোজ। সারাদিন না খেয়ে থাকার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বা ‘Blood Sugar’ কমে যায়। ইফতারের শুরুতে খেজুরের স্মুদি পান করলে এটি দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তির জোগান দেয়। এতে থাকা জটিল শর্করা শরীরের ক্লান্তি ও দুর্বলতা দূর করে মুহূর্তেই সতেজ ভাব ফিরিয়ে আনে।
ডিহাইড্রেশন রোধ ও ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য তীব্র গরমে রোজা রাখার ফলে শরীরে পানির স্বল্পতা বা ‘Dehydration’ দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। দুধ বা দইয়ের সঙ্গে খেজুর ব্লেন্ড করে তৈরি করা এই স্মুদি শরীরে প্রয়োজনীয় তরল সরবরাহ করার পাশাপাশি ‘Electrolyte Balance’ বজায় রাখতে সাহায্য করে। খেজুরে থাকা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম পেশির খিঁচুনি রোধ করে এবং হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা স্বাভাবিক রাখে।
হজম প্রক্রিয়া ও মেটাবলিজম বৃদ্ধি ইফতারে সাধারণত ভাজাপোড়া খাওয়ার প্রবণতা থাকে, যা পাকস্থলীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। খেজুরের স্মুদিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার (Dietary Fiber), যা হজম প্রক্রিয়াকে সহজতর করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে কার্যকর। এটি পেটের অস্বস্তি কমিয়ে ‘Metabolism’ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, ফলে ইফতার পরবর্তী অলসতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের জোগান খেজুর আয়রনের একটি চমৎকার উৎস। যারা রক্তশূন্যতা বা ‘Anemia’ সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য নিয়মিত খেজুরের স্মুদি পান করা অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া এতে থাকা বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (Antioxidant) শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘Immune System’ শক্তিশালী করে এবং কোষের ক্ষয় রোধে সাহায্য করে।
ক্লান্তি ও মাথাব্যথা নিরসন দীর্ঘক্ষণ উপবাসের পর অনেকেরই মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরার সমস্যা দেখা দেয়। এটি মূলত শরীরে খনিজের অভাব এবং নিম্ন রক্তচাপের কারণে হয়। খেজুরের স্মুদি শরীরকে প্রয়োজনীয় মিনারেল সরবরাহ করে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে এবং মানসিক প্রশান্তি আনতে ভূমিকা রাখে।
পুষ্টিবিদদের বিশেষ রেসিপি: ঝটপট খেজুরের স্মুদি বাজারের কৃত্রিম চিনিযুক্ত পানীয় বা অতিরিক্ত মিষ্টি শরবতের চেয়ে ঘরে তৈরি ফ্রেশ স্মুদি অনেক বেশি কার্যকর।
উপকরণ: ৩-৪টি ভালো মানের খেজুর (বীজ ছাড়িয়ে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখা), ১ গ্লাস ঠান্ডা দুধ অথবা ঘন দই, সামান্য মধু (প্রয়োজনে), কয়েকটি কাঠবাদাম বা কাজুবাদাম।
প্রস্তুত প্রণালি: সব উপকরণ একসাথে ব্লেন্ডারে দিয়ে মসৃণ বা ‘Creamy Texture’ না হওয়া পর্যন্ত ব্লেন্ড করুন। চাইলে স্বাদের ভিন্নতায় সামান্য এলাচ গুঁড়ো বা বরফ কুচি যোগ করতে পারেন। উপরে বাদাম কুচি দিয়ে সাজিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।
ইফতারে ভাজাপোড়া কমিয়ে এমন পুষ্টিকর পানীয় বেছে নিলে তা কেবল রসনাতৃপ্তিই দেবে না, বরং আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতাও নিশ্চিত করবে। রমজানের ক্লান্তি দূর করে সুস্থ থাকতে ‘খেজুরের স্মুদি’ হোক আপনার প্রতিদিনের ইফতারের সঙ্গী।