বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী বক্তব্যে জানিয়েছেন, দেশ বর্তমানে এক নতুন গণতান্ত্রিক (Democratic) যাত্রায় পদার্পণ করেছে। সশস্ত্র বাহিনী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রদর্শিত আদর্শ ও মহান ত্যাগের পথ অনুসরণ করেই আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে চায়। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ঢাকা সেনানিবাসে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে সেনাবাহিনী আয়োজিত এক বিশেষ ইফতার ও দোয়া মাহফিলে তিনি এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
১৮ মাসের চ্যালেঞ্জ ও সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব বিগত দেড় বছরের অস্থির ও ক্রান্তিকালীন সময়কে ‘বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে অভিহিত করে সেনাপ্রধান বলেন, “বিগত ১৮ মাস দেশের জন্য একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সময় ছিল। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গভীর দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম এবং সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব (Professionalism) বজায় রেখে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রতিটি সংকটে সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে থেকে জাতীয় স্থিতিশীলতা (National Stability) রক্ষায় সচেষ্ট ছিল এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শ জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর বক্তব্যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “দেশ এখন একটি গণতান্ত্রিক ধারায় প্রবেশ করেছে এবং এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।” তিনি মনে করেন, একাত্তরের রণাঙ্গনের বীরদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় চেতনার মূল ভিত্তি। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখানো সেই অসাম্প্রদায়িক ও ন্যায়বিচারভিত্তিক পথই হবে আধুনিক বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। তিনি বলেন, “মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাঁদের বীরত্বগাথা আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। ঠিক তেমনিভাবে সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগও বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।” এই সময় তিনি সিভিল-মিলিটারি রিলেশনস (Civil-Military Relations) বা সামরিক ও বেসামরিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণা ও বীরদের সংহতি ইফতার মাহফিলের বিশেষ সেশনে একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর সেনানিরা সমবেত হয়ে তাঁদের রক্তঝরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা সেনাবাহিনীর এই অভাবনীয় উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীর সময়োপযোগী ও সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেন। স্মৃতিচারণা পর্বে তাঁরা বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হওয়ার আহ্বান জানান।
দোয়া ও সমাপ্তি অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিপুল সংখ্যক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন। ইফতারের প্রাক্কালে দেশ ও জাতির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি, শান্তি এবং বীর শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা একটি স্থিতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে সশস্ত্র বাহিনীর অঙ্গীকার হিসেবে দেখছেন।