মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করতে বড় ঘোষণা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সব ধরনের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল ও স্বচ্ছ তালিকা (Accurate Database) প্রকাশ করবে সরকার। শনিবার (২৮ মার্চ) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত বীর মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অতীতের ত্রুটি সংশোধন ও সঠিক জরিপের প্রতিশ্রুতি
মন্ত্রী তার বক্তব্যে অতীতের অসংগতির কথা তুলে ধরে বলেন, এর আগে সঠিক কোনো বৈজ্ঞানিক জরিপ বা ভেরিফিকেশন (Verification) ছাড়াই যে ৩০ লাখ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করা হয়েছিল, তা নিয়ে জনমনে এবং খোদ মুক্তিযোদ্ধা সমাজে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। আমরা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছি যাতে কোনো অযোগ্য ব্যক্তি এই তালিকায় স্থান না পায় এবং প্রকৃত একজন বীরও যেন বাদ না পড়েন।”
ইতিহাসের শ্রেষ্ঠত্ব ও রাজনৈতিক অর্জনের পার্থক্য
মুক্তিযুদ্ধের অনন্য গুরুত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে আহমেদ আযম খান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান আমাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন (Political Achievement)। তবে এই লড়াইগুলোকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে মেলানো সমীচীন হবে না। মুক্তিযুদ্ধের মহিমা ও এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা চূড়ান্ত করা হবে বলে তিনি দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও পুনর্বাসনের দাবি
অনুষ্ঠানে ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে সরকারের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা (Allowance) বৃদ্ধি করা জরুরি। সেই সঙ্গে তাদের আবাসন ও পুনর্বাসন (Rehabilitation) এবং সব সরকারি সুযোগ-সুবিধা বিনা মূল্যে প্রদানের জন্য একটি সমন্বিত পলিসি (Integrated Policy) তৈরির আহ্বান জানান তিনি। প্রশাসক আরও বলেন, ভুয়া সনদধারীরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভোগ করছে, যা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অপমানজনক। তাই তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বীর যোদ্ধাদের আক্ষেপ ও স্মৃতিচারণা
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকশ বীর মুক্তিযোদ্ধা তাদের রণাঙ্গনের স্মৃতি রোমন্থন করেন। তবে তাদের কণ্ঠে ছিল এক গভীর আক্ষেপ। আমন্ত্রিত মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রবেশের কারণে দীর্ঘ পাঁচ দশকেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান নিশ্চিত হয়নি। তারা নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃতমুক্ত সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান। তারা মনে করেন, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (MIS) ব্যবহার করে একটি প্রশ্নাতীত তালিকা প্রণয়ন করাই হবে তাদের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্মান।
সরকারের নীতি ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা
মন্ত্রী আহমেদ আযম খান মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্বস্ত করে বলেন, তাদের সব যৌক্তিক দাবি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। সরকারি সুবিধাভোগীদের ডিজিটাল ডেটাবেজ (Digital Database) তৈরির কাজ চলছে, যা ভুয়াদের চিহ্নিত করতে সহায়ক হবে। অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।