দেশের সাম্প্রতিক হামের (Measles) প্রাদুর্ভাব এবং এর আনুষঙ্গিক নিউমোনিয়াজনিত (Pneumonia) জটিলতায় শিশুমৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় এবার এক যুগান্তকারী ও সাশ্রয়ী সমাধান নিয়ে এগিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b)। আইসিডিডিআর,বি-র নিজস্ব উদ্ভাবন ‘বাবল সিপ্যাপ’ (Bubble CPAP) এখন দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই ‘ম্যাজিক মেশিন’ বাবল সিপ্যাপের ব্যবহার দ্রুত বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও ৩০০ টাকার চমৎকারিত্ব
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আইসিডিডিআর,বি-র একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ এবং প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. জুবায়ের চিশতী বর্তমান পরিস্থিতি ও বাবল সিপ্যাপের কার্যকারিতা তুলে ধরেন। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ (The Lancet)-এর প্রতিবেদনেও এই প্রযুক্তির প্রশংসা করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একটি প্রথাগত ‘Mechanical Ventilator’-এর দাম কয়েক লক্ষ টাকা হলেও, বাবল সিপ্যাপ তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ৩০০ টাকার মতো। এই ‘Low-cost Innovation’ প্রচলিত অক্সিজেন সরবরাহ পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং এটি শিশুদের রক্তে ‘Oxygen Saturation’ দ্রুত স্বাভাবিক করতে সক্ষম। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়ায় পরিচালিত ‘Clinical Trial’-এ দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক শতাংশ কমে যায়।
হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু স্বাস্থ্যের ঝুঁকি
আইসিডিডিআর,বি-র তথ্যমতে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবে ৬ মাস থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩০ শতাংশই মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। শ্বাসকষ্টজনিত এই জটিলতা নিরসনে দ্রুত অক্সিজেন সাপোর্ট অপরিহার্য। আইসিডিডিআর,বি-র এই প্রস্তাবনার গুরুত্ব অনুধাবন করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবিলম্বে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
দেশজুড়ে বাস্তবায়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি
এই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার দুপুরেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দেশের ৩০টিরও বেশি সরকারি হাসপাতালের পরিচালক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ড. জুবায়ের চিশতী বাবল সিপ্যাপের কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যা করেন। এ সময় শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক এবং আইসিএমএইচ মাতুয়াইলের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সফল অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আইসিডিডিআর,বি কারিগরি অংশীদার (Technical Partner) হিসেবে কাজ করবে। প্রশিক্ষণের প্রথম ধাপ হিসেবে আগামী বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) থেকে শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবু হোসাইন মো. মইনুল আহসান এই সামগ্রিক কার্যক্রমের সমন্বয় করবেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সুরক্ষা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাবল সিপ্যাপের ব্যাপক ব্যবহার কেবল হামজনিত নিউমোনিয়া নয়, বরং শিশুদের অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা মোকাবিলায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। সাশ্রয়ী মূল্যের এই ‘Medical Device’ দেশের উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, যা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। দেশীয় এই উদ্ভাবন এখন কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়, বরং উন্নয়নশীল বিশ্বের শিশুদের প্রাণ রক্ষায় এক আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।