বাংলাদেশের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ের পুঞ্জীভূত দাবি আবারও রাজপথে আছড়ে পড়েছে। যিশু খ্রিস্টের পবিত্র পুনরুত্থান দিবস বা ‘ইস্টার সানডে’-কে সরকারি ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে সোচ্চার হয়েছে দেশের খ্রিস্টান সমাজ। তারা মনে করছেন, এটি কেবল একটি ছুটির বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা এবং সব ধর্মের সমান স্বীকৃতির একটি মৌলিক মানদণ্ড।
রাজপথে কয়েক দশকের অমীমাংসিত দাবি
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল মানববন্ধনে কয়েক শতাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সেখানে বক্তারা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সরকারের আমলে বারবার আবেদন জানানো সত্ত্বেও বিষয়টি দশকের পর দশক ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্সের সহ-সভাপতি বিশপ জের্ভাস রোজারিও এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, “সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমল থেকেই এই দাবি উত্থাপিত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর কাছেও আমরা বারবার স্মারকলিপি দিয়েছি। প্রতিটি সরকারই আমাদের আশ্বস্ত করেছে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো ‘Policy Level’ থেকে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।” তিনি আরও জানান, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও তা কেবল ‘কথার আশ্বাসেই’ সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ধর্মীয় গুরুত্ব ও উৎসবের সংকট
খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, বড়দিনের চেয়েও ‘ইস্টার সানডে’র আধ্যাত্মিক তাৎপর্য কোনো অংশে কম নয়। যিশু খ্রিস্টের মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে কেন্দ্র করে এই উৎসব উদযাপিত হয়। বিশপ রোজারিও আক্ষেপ করে বলেন, “ইস্টার সানডেকে কেন্দ্র করে সরকারি ছুটি না থাকায় অনেক বিশ্বাসী চার্চের মূল উপাসনায় অংশ নিতে পারেন না। সরকারি ও বেসরকারি অফিসে কর্মব্যস্ততার কারণে ধর্মীয় আচার পালন ব্যাহত হয়, যা আমাদের ‘Fundamental Rights’-এর পরিপন্থী।”
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও একে নাগরিক অধিকারের ইস্যু হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “অন্যান্য বড় ধর্মীয় সম্প্রদায় একাধিক সরকারি ছুটি ভোগ করে থাকে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ‘Communal Harmony’ বজায় রাখতে খ্রিস্টানদের জন্য এই একটি বাড়তি ছুটি ঘোষণা করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।”
পেশাগত জীবন ও ধর্মীয় বিশ্বাসের টানাপড়েন
ছুটি না থাকায় সাধারণ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা কীভাবে বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হন, তার চিত্র ফুটে ওঠে মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের কথায়। নার্সিং ইন্সট্রাক্টর মালা রিবেরু তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “পেশাগত দায়িত্ব (Professional Duty) আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাসও আত্মার অংশ। সরকারি ছুটি না থাকায় আমাদের প্রায়ই কর্মক্ষেত্র এবং প্রার্থনা—এই দুইয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়। অনেক সময় ইস্টার সানডেতেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বা মিটিং নির্ধারণ করা হয়, যা আমাদের জন্য চরম বৈষম্যমূলক।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গাড়িচালক সুজন নকরেকের কণ্ঠে ঝরে পড়ে আবেগ। তিনি বলেন, “ঈদে যেমন মুসলিম ভাইয়েরা পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন, আমাদের কাছে ইস্টারও তেমনই আনন্দের দিন। কিন্তু অফিস খোলা থাকায় আমরা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারি না। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
সাম্যের প্রত্যাশায় খ্রিস্টান সমাজ
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া চার্চ নেতারা এবং অধিকার কর্মীরা একমত যে, একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের সমান অধিকার থাকা বাঞ্ছনীয়। তারা আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকার তাদের এই ন্যায়সঙ্গত দাবিটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই বঞ্চনার অবসান ঘটাবে।
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের এই দাবি এখন কেবল ধর্মীয় পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অধিকার ও মানবাধিকার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করেন, ‘ইস্টার সানডে’তে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হলে তা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ধর্মীয় সহনশীলতা ও সাম্যের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করবে।