• জাতীয়
  • মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছায়া, চরম অনিশ্চয়তায় লাখো প্রবাসী শ্রমিক: আয় কমেছে অর্ধেক, বাড়ছে ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক!

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছায়া, চরম অনিশ্চয়তায় লাখো প্রবাসী শ্রমিক: আয় কমেছে অর্ধেক, বাড়ছে ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক!

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছায়া, চরম অনিশ্চয়তায় লাখো প্রবাসী শ্রমিক: আয় কমেছে অর্ধেক, বাড়ছে ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক!

গালফ অঞ্চলে সংঘাতের জেরে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গভীর উদ্বেগ; ‘কাফালা’ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বৈশ্বিক তোলপাড়।

মধ্যপ্রাচ্যের গালফ অঞ্চলে ঘনীভূত হওয়া ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি আছড়ে পড়েছে প্রবাসী শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনে। একদিকে যুদ্ধের দামামা আর নিরাপত্তা ঝুঁকি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দা ও নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন কয়েক মিলিয়ন অভিবাসী কর্মী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) বুধবার (১ এপ্রিল) এক বিশেষ বিবৃতিতে জানিয়েছে, চলমান অস্থিতিশীলতা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) ভুক্ত দেশগুলোতে অবস্থানরত শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সতর্কতা: ঝুঁকির মুখে গালফ অঞ্চলের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধারা’

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, গালফ অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, সংঘাত-সম্পর্কিত বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন প্রবাসী শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এই নিরাপত্তাহীনতা কেবল শারীরিক নয়, বরং মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবেও শ্রমিকদের বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে রণক্ষেত্রের কাছাকাছি থাকা কর্মস্থলগুলো এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

আয় কমেছে অর্ধেক, দ্বিগুণ হয়েছে নিত্যপণ্যের দাম

সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে গালফ অঞ্চলের ‘Gig Economy’ বা কমিশনভিত্তিক কাজের ওপর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা ড্রাইভার বা ডেলিভারি কর্মী (Delivery Worker) হিসেবে কর্মরত, তাদের আয় অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সংঘাতের কারণে মানুষের চলাচল সীমিত হওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) ভেঙে পড়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। শ্রমিকরা জানিয়েছেন, গত কয়েক সপ্তাহে মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে, যা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবারে টাকা পাঠানোর সক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে। শ্রমের ‘Market Value’ কমে যাওয়ায় প্রবাসীদের সঞ্চয় এখন শূন্যের কোঠায়।

পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে ধস: টেক জায়ান্টদের বিনিয়োগে স্থবিরতা

মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিকায়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল পর্যটন (Tourism) ও আতিথেয়তা (Hospitality) খাত। কিন্তু চলমান সংঘাত এই খাতকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অনেক বড় বড় হোটেল ও রিসোর্ট কর্মীদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাচ্ছে কিংবা বেতন কমিয়ে দিচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিজ খরচে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, যা একজন স্বল্প আয়ের প্রবাসীর জন্য প্রায় অসম্ভব।

প্রযুক্তি খাতের আধুনিকায়ন এবং বড় বড় Data Center নির্মাণ কিংবা গ্লোবাল Tech Giant-দের বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো এই অস্থিরতার কারণে বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে নতুন করে Job Creation বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি থমকে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগও এই অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল স্টাফদের ওপর।

কাফালা পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের উপপরিচালক মাইকেল পেজ এই সংকটকে বিদ্যমান শ্রমব্যবস্থার একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি কাফালা (Kafala) পদ্ধতির মতো সেকেলে ও বৈষম্যমূলক শ্রমব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও প্রকটভাবে সামনে এনেছে।” কাফালা ব্যবস্থার কারণে শ্রমিকরা সহজে নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করতে পারেন না, এমনকি সংকটকালীন সময়েও তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।

এই সংকট নিরসনে গালফ দেশগুলোকে দ্রুত ‘Fair Wage’ বা ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি। পাশাপাশি যারা এই মুহূর্তে চাকরি হারিয়েছেন বা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তাদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, প্রবাসী শ্রমিকদের এই অনিশ্চয়তা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। সরকারের পক্ষ থেকে এই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’দের সুরক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির দাবি এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

Tags: middle east bangladeshi workers labor rights migrant workers gulf crisis economic impact job loss hrw report remittance earners kafala system