ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে শামিল হতে ফ্রান্সের অস্বীকৃতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে নজিরবিহীন ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। কূটনৈতিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে ট্রাম্প এবার সরাসরি টেনে এনেছেন ম্যাক্রোঁর ব্যক্তিগত ও দাম্পত্য জীবনের প্রসঙ্গ। এমনকি ফরাসি ফার্স্ট লেডি (First Lady) ব্রিজিত ম্যাক্রোঁ তাঁর স্বামীর সঙ্গে ‘বাজে’ আচরণ করেন বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
হরমুজ প্রণালী ও বিশ্ব বাজারের অস্থিরতা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্লোবাল অয়েল মার্কেট (Global Oil Market)-এ। হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কা তৈরি করেছে।
মিত্রদের অনীহা ও ট্রাম্পের হুমকি ট্রাম্প প্রশাসন গত এক মাস ধরে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালালেও তাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প তাঁর ন্যাটো (NATO) মিত্রদের, বিশেষ করে ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে এই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার জন্য প্রবল চাপ দিচ্ছেন। তবে ফ্রান্সসহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে নারাজ। মিত্রদের এই ‘নিষ্ক্রিয়তায়’ ক্ষিপ্ত ট্রাম্প ইতিমধ্যে ন্যাটো জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন এবং ইউরোপীয় নেতাদের ওপর ব্যক্তিগতভাবে ক্ষোভ ঝাড়ছেন।
ম্যাক্রোঁকে নিয়ে ট্রাম্পের সেই বিতর্কিত মন্তব্য বুধবার (১ এপ্রিল) হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক ব্যক্তিগত মধ্যাহ্নভোজ সভায় ট্রাম্প তাঁর ক্ষোভ উগরে দেন। ফরাসি প্রেসিডেন্টের সহায়তা না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, “আমাদের তাদের সহায়তার কোনো প্রয়োজন নেই, কিন্তু তবুও আমি শিষ্টাচারের খাতিরে চেয়েছিলাম।”
এরপরই তিনি সরাসরি আক্রমণ করেন ম্যাক্রোঁর ব্যক্তিগত জীবনে। ট্রাম্প বলেন, “আমি ম্যাক্রোঁকে ফোন করেছিলাম—যার স্ত্রী তাঁর সাথে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করেন। চোয়ালে স্ত্রীর এক ঘুষির ধাক্কা তিনি এখনো সামলে উঠতে পারেননি।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য মূলত গত বছর ম্যাক্রোঁর একটি বিতর্কিত সফর নিয়ে তৈরি হওয়া গুঞ্জনকে উস্কে দিয়েছে।
পুরানো ‘অপতথ্য’ যখন ট্রাম্পের হাতিয়ার ২০২৫ সালের মে মাসে সস্ত্রীক ভিয়েতনাম সফরে গিয়েছিলেন ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। সেই সময় গুঞ্জন ছড়িয়েছিল যে, বিমানের ভেতরে একটি তর্কের জেরে ফার্স্ট লেডি ব্রিজিত ম্যাক্রোঁ প্রেসিডেন্টকে আঘাত করেছেন। মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপি-র এক সাংবাদিকের ক্যামেরায় সেই মুহূর্তের কিছু অস্পষ্ট দৃশ্য ধরা পড়লেও এলিসি প্যালেস থেকে একে ‘অপতথ্য’ বা মিস-ইনফরমেশন (Misinformation) হিসেবে কঠোরভাবে অস্বীকার করা হয়েছিল। ট্রাম্প এখন সেই পুরনো বিতর্ককে রাজনৈতিক স্বার্থে এবং ব্যক্তিগত অপমানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অন্য দেশের প্রেসিডেন্টের এমন প্রকাশ্য উপহাস কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূতই নয়, বরং এটি ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের (Trans-Atlantic relations) ফাটলকে আরও প্রশস্ত করবে। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে তৈরি হওয়া এই বিভাজন বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ মেরুকরণে নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।