ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জীবনযাত্রাজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি। চিকিৎসকদের মতে, কেবল নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা ওষুধের ওপর নির্ভর করলেই এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্টের (Diabetes Management) অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয় নিয়মিত শারীরিক ব্যায়ামকে। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন (ADA) সহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো বলছে, যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তারা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবন যাপন করতে পারেন।
ব্যায়াম কেন ওষুধের মতোই কার্যকর?
শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীরে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি (Insulin Sensitivity) বৃদ্ধি পায়। এতে শরীরের কোষগুলো রক্তে থাকা শর্করা বা সুগারকে জ্বালানি হিসেবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে। নিয়মিত কসরত কেবল ওজন কমায় না, বরং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এনডিটিভির এক হেলথ রিপোর্ট অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে মাঝারি মানের ব্যায়াম করলে হার্ট রেট উন্নত হয় এবং সামগ্রিক মেটাবলিজম (Metabolism) ত্বরান্বিত হয়।
ঘরোয়া পরিবেশে ব্যায়ামের কার্যকর ১০ উপায়
করোনা পরবর্তী সময়ে কিংবা ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অনেকেরই জিমে যাওয়া বা বাইরে হাঁটার সুযোগ হয় না। এই সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (IDF) ঘরে বসে ব্যায়াম করার কিছু বিশেষ গাইডলাইন দিয়েছে:
১. ঘরকেই বানান হাঁটার জায়গা: প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় নিয়ম করে বাসার বারান্দা বা বসার ঘরে হাঁটাহাঁটি করুন। ২. ছাদের ব্যবহার: বাড়ির ছাদ যদি খোলামেলা হয় এবং লোকসমাগম কম থাকে, তবে সেখানে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ৩. খাবারের পর স্বল্প হাঁটা: একবারে ৩০ মিনিট সময় না পেলে কিস্তিতে ব্যায়াম করুন। সকাল, দুপুর ও রাতের খাবারের অন্তত দেড় ঘণ্টা পর ১৫ মিনিট করে হাঁটলে পোস্ট-প্র্যান্ডিয়াল গ্লুকোজ (Post-Prandial Glucose) নিয়ন্ত্রণে থাকে। ৪. ওয়ার্ম আপ ও কুলিং ডাউন: হুট করে ভারী ব্যায়াম শুরু করবেন না। শুরুতে ৫-১০ মিনিট ‘ওয়ার্ম আপ’ (Warm-up) এবং শেষে শরীর শিথিল করার জন্য ‘কুলিং ডাউন’ (Cooling-down) করা অত্যন্ত জরুরি। ৫. সরঞ্জামের ব্যবহার: যাদের সামর্থ্য আছে, তারা ঘরেই ট্রেডমিল (Treadmill) বা স্ট্যাটিক সাইকেল (Static Cycle) ব্যবহার করতে পারেন। এক্ষেত্রে ২০ মিনিটের ব্যায়ামই যথেষ্ট। ৬. রেজিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ: দেয়াল বা কোনো শক্ত আসবাবের বিপরীতে হাত-পা দিয়ে চাপ দিয়ে শরীরের ওজন ধরে রাখার চেষ্টা করুন। এই ধরনের ‘রেজিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ’ (Resistance Exercise) পেশির শক্তি বাড়ায়। ৭. স্কিপিং বা দড়ি লাফ: কম বয়সীদের জন্য দড়ি লাফ বা স্কিপিং (Skipping) অত্যন্ত কার্যকর একটি কার্ডিও ব্যায়াম। দিনে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ বার লাফ দিলে দ্রুত ক্যালরি বার্ন হয়। ৮. জয়েন্ট মোিবলিটি: বয়স নির্বিশেষে সবার জন্য অস্থিসন্ধির ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটু, কোমর, ঘাড় ও গোড়ালি ঘোরানোর ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং করলে শরীরের নমনীয়তা বজায় থাকে। ৯. নিয়মিত ধারাবাহিকতা: ব্যায়ামের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বা কনসিস্টেন্সি সবচেয়ে বড় বিষয়। একদিন অনেক বেশি ব্যায়াম করে বাকি কয়েকদিন বিরতি দিলে সুফল পাওয়া যায় না। ১০. অসুস্থতায় সতর্কতা: শরীরে যদি জ্বর, ডায়রিয়া বা অন্য কোনো সংক্রমণ থাকে, তবে ব্যায়াম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখুন। শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ হলে পুনরায় নিয়মিত রুটিনে ফিরে আসুন।
সতর্কবার্তা
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যাদের হৃদরোগ বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো শারীরিক জটিলতা আছে, তাদের জন্য ‘ইনটেনসিটি’ বা ব্যায়ামের মাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি। মনে রাখবেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামই পারে আপনাকে একটি ইনসুলিন-মুক্ত সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে।