নির্বাচন কেন্দ্রিক অস্থিরতা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার কঠোর সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন। বিরোধীদের উগ্র আচরণের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “এখনই যদি মাথা এত গরম থাকে, তবে ভোটের চূড়ান্ত সময় তথা চৈত্র এলে আপনারা কী করবেন?”
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সহিংতায় উদ্বেগ ও বিরোধীদের হুঁশিয়ারি
দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, একদিকে সরকারি সুযোগ-সুবিধার নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া হচ্ছে, আর অন্যদিকে বিরোধী মতের মা-বোনদের গায়ে হাত তোলা হচ্ছে। এই দ্বিচারিতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে চাই না। তবে কেউ যদি গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে আসে, তবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে না।” রাজনৈতিক উসকানি মোকাবিলায় নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি শক্ত অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
'বেকার ভাতা নয়, চাই সম্মানজনক কর্মসংস্থান'
দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব দূরীকরণে জামায়াতের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ঘোষণা করেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নাগরিকদের বেকার ভাতা বা খয়রাতি সাহায্যের মাধ্যমে অপমানিত করবে না। বরং আধুনিক Job Creation-এর মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষিত ও দক্ষ যুবকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। জুলাই বিপ্লবে তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করাই হবে আমাদের প্রধান কাজ। আমরা তাদের হাতে ভিক্ষার ঝুলি নয়, উপার্জনের হাতিয়ার তুলে দিতে চাই।”
খুলনার শিল্প বিপ্লব ও হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার
খুলনা অঞ্চলের মৃতপ্রায় শিল্প খাত নিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং ব্যাপক লুটপাটের কারণে খুলনার জুট মিলসহ অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জামায়াত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বন্ধ থাকা সব মিল-কারখানা চালুর পাশাপাশি নতুন নতুন Industrial Zone গড়ে তুলবে। কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রসারেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
ভোটের পাহারাদার হওয়ার আহ্বান
আসন্ন ১৩ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে ‘ভোটের পাহারাদার’ হওয়ার ডাক দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “আমরা শুধু চাই ভোটাররা যেন নিরাপদে ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। প্রতিটি নাগরিকের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।” একটি ‘অভিশাপমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
নতুন বাংলাদেশের রোডম্যাপ ও স্থানীয় উন্নয়ন
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির রাজনীতিতে লিপ্তরা আবারও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তিনি খুলনার জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণ, পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ এবং সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে Tourism Industry-র বিকাশে জামায়াতের মহাপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
খুলনা মহানগর আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় নির্ধারিত সময়ের আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় সার্কিট হাউস মাঠ। উপস্থিত জনতা শ্লোগানে শ্লোগানে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যকে স্বাগত জানায়। জামায়াত নেতারা দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াত যে সংযম ও পাহারাদারের ভূমিকা পালন করেছে, তাতে জনগণের আস্থা কয়েকগুণ বেড়েছে।