বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এ দেশে আর কোনো বিশেষ পরিবারের শাসন চলবে না; বরং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও মতামতের ভিত্তিতে। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) খুলনা বিভাগের যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে আয়োজিত পৃথক জনসভায় তিনি এই নতুন রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেন। ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দলীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
যশোরের উন্নয়ন ও নারী নিরাপত্তার হুঁশিয়ারি
মঙ্গলবার সকালে যশোর কেন্দ্রীয় ইদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে যশোরবাসীর সব ন্যায্য দাবি পূরণ করা হবে, যার মধ্যে সিটি করপোরেশন গঠন অন্যতম। উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা কোনো জেলা বা অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য হতে দেব না।”
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। জামায়াত আমির বলেন, “একটি নির্দিষ্ট দল ক্ষমতায় গেলে নারীদের 'ফ্যামিলি কার্ড' দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অথচ বাস্তবে তারাই নারী কর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেললে তার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।”
রাজনৈতিক আচরণ ও ফ্যাসিবাদের অবসান
বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি পরামর্শ দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আপনারা আপনাদের আদর্শ প্রচার করুন, আমরা আমাদেরটা করি। রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখা জরুরি। কেউ যদি নতুন করে ফ্যাসিবাদের (Fascism) পথে হাঁটতে চায়, তবে ছাত্র-জনতা তা কঠোরভাবে রুখে দেবে।” তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের আচরণ সংশোধনের আহ্বান জানিয়ে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।
ভারত নীতি: ‘প্রভু নয়, বন্ধু হিসেবে সম্পর্ক চাই’
দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভায় জামায়াত আমির প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন নিয়ে কথা বলেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “আমরা প্রতিবেশীদের বন্ধু হিসেবে দেখতে চাই, কিন্তু কাউকে প্রভু হিসেবে মেনে নেব না। ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে একটি উত্তম কূটনৈতিক সম্পর্ক (Strategic Relationship) বজায় রাখা আমাদের লক্ষ্য।”
একই সমাবেশে তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন গণভোট বা নির্বাচন প্রসঙ্গে গুরুত্বারোপ করে বলেন, “এই নির্বাচন আজাদি বা স্বাধীনতার প্রতীক। হ্যাঁ ভোট মানে আজাদি, আর না ভোট মানে গোলামি। ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম সিলটি পড়বে 'হ্যাঁ' বাক্সে।” এ সময় তিনি ক্ষমতায় গেলে বাজার সিন্ডিকেট (Market Syndicate) ভেঙে দেওয়া এবং চাঁদাবাজদের কঠোর হস্তে দমনের প্রতিশ্রুতি দেন।
বেকার ভাতা বনাম কর্মসংস্থান: নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে আয়োজিত নির্বাচনী সভায় ডা. শফিকুর রহমান তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। তিনি প্রচলিত 'বেকার ভাতা'র রাজনীতির বিরোধিতা করে বলেন, “যুবকদের বেকার ভাতা দেওয়া মানে তাদের মেধার অপমান করা। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বেকার ভাতার পরিবর্তে তাদের হাতে দক্ষতা বৃদ্ধির (Skill Development) সুযোগ এবং সম্মানজনক কাজ (Job Creation) তুলে দেবে।”
দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি হামলাকারীদের কঠোর সমালোচনা করেন এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি ইনসাফপূর্ণ বেতন কাঠামো (Pay Scale) নিশ্চিত করার কথা বলেন।
ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ ও ১১ দলীয় জোটের লক্ষ্য
সন্ধ্যায় বাগেরহাটের খান জাহান আলী মাজার মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের জনসভায় যোগ দেন জামায়াত আমির। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করতে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পেশিশক্তি ব্যবহার করছে। তিনি সরকারি প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানান।
বিভাগীয় এই সফরের প্রতিটি সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। বক্তারা ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে দেশের সম্পদ রক্ষায় নেতাকর্মীদের ‘পাহারাদারের’ ভূমিকা পালন করার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, একটি ইনসাফ কায়েমকারী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এখন জামায়াতের প্রধান লক্ষ্য।