তবে ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, উৎসবের আমেজ ছাপিয়ে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে একজন নিহতের ঘটনা দেশজুড়ে উত্তাপ ছড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, শেরপুরসহ দেশজুড়ে সাম্প্রতিক এই সংঘাত জাতীয় নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে? এটি কি কেবল ক্ষমতার লড়াই, নাকি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ব্যর্থতা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের সংঘাত নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ এবং ভোটারদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষ একটি রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের পর নতুন ভোরের অপেক্ষায় ছিল। একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই পারে সেই স্বপ্নের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে। কিন্তু শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে জামায়াত নেতার প্রাণহানি আমাদের ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। এখন সময় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের।
সহিংসতা নয়, বরং নীতির লড়াই হোক নির্বাচনের মূল ভিত্তি—এমনটিই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে যাবে, নাকি পুরনো সহিংসতার আবর্তে ঘুরপাক খাবে, তা নির্ভর করছে আগামী দুই সপ্তাহের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে এখনই কঠোর শপথ নিতে হবে—একটি জীবনের বিনিময়েও কোনো ক্ষমতার মসনদ কাম্য নয়।
শেরপুরের রক্তক্ষয়ী সেই দিন: যা ঘটেছিল
গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুর-৩ (ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী) আসনে যে ঘটনা ঘটেছে, তাকে অনেকেই নির্বাচনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ঝিনাইগাতী স্টেডিয়াম মাঠে সব প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল এবং বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলসহ অন্যান্যরা। প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, সামনের সারির চেয়ারে বসা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। জামায়াত প্রার্থীর দাবি অনুযায়ী, তারা আগে এসে আসনে বসেন। পরে আসা বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকদের জন্য ইউএনও আসন ছাড়তে মাইকে অনুরোধ করেন।
কিন্তু বিএনপির নেতাকর্মীরা আসন দখলের চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। বিএনপির নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জামায়াত ও ১১-দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সংঘর্ষের এক পর্যায়ে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম দলছুট হয়ে পড়লে তাকে একা পেয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হন, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। জামায়াতের প্রতিবাদ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুর ১২টায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামী এই ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করেন, বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের সরাসরি নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, "সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ এবং উপজেলা প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। প্রশাসন একদিকে হেলে পড়েছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বলে কিছু থাকবে না।”
জামায়াত মনে করছে, পরিকল্পিতভাবে তাদের প্রার্থীকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে। প্রশাসনের এই নিষ্ক্রিয়তা ভোটারদের মনে বড় ধরনের অনাস্থা তৈরি করছে।
বিএনপির পাল্টা অভিযোগ ও অবস্থান
অন্যদিকে, বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহাদী আমিন একই দিন রাজধানীর গুলশানে এক সংবাদ সম্মেলনে শেরপুরের ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন জামায়াতের দিকেই। মাহাদী আমিনের মতে, “কেন একটি দল নির্ধারিত সময়ের আগে সব চেয়ার দখল করে রাখল? প্রশাসনের অনুরোধ সত্ত্বেও তারা কেন চেয়ার ছাড়েনি?”
তিনি দাবি করেন, এই সংঘর্ষে বিএনপির ৪০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় এবং কোনো উসকানিতে পা দিতে চায় না। তবে মাঠ পর্যায়ে জামায়াত ও বিএনপির এই মুখোমুখি অবস্থান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে।
সারা দেশের সামগ্রিক চিত্র: সংঘাতের বিস্তার
কেবল শেরপুর নয়, নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশের অন্তত ২০টি জেলায় ছোট-বড় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই তীব্র হয়ে উঠেছে। পোস্টার ছেঁড়া, নির্বাচনী ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ এবং ঘরোয়া বৈঠকে হামলা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শতাধিক ব্যক্তি নির্বাচনী সহিংসতায় আহত হয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ এবং আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা মাঠ পর্যায়ে সংঘাতের মূল কারণ।
ধর্মীয় কার্ড ও অপপ্রচার: নতুন আতঙ্ক
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ‘ধর্মীয় কার্ড’-এর ব্যবহার। বিশ্লেষকরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছেন যে, অনেক প্রার্থী জনসেবার চেয়ে ভোটারদের ধর্মীয় অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। মসজিদের খুতবা কিংবা ওয়াজ মাহফিলে পরোক্ষভাবে প্রচার চালানো হচ্ছে।
অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ মনে করেন, “যখন প্রার্থীরা নীতির বদলে পরকালের ভয় দেখিয়ে ভোট আদায়ের চেষ্টা করেন, তখন নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য ক্ষুণ্ণ হয়। এটি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।”
ডিজিটাল স্পেসে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচার ও ফেক নিউজ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা নির্বাচনী সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, “নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় কার্ডের ব্যবহার এবং পেশিশক্তির আস্ফালন গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। এটি কেবল ভোটারদের বিভক্তই করে না, আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করে।”
শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের শিক্ষক তৌহিদুল ইসলাম মনে করেন, এই নির্বাচন ২০২৪-এর বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের বড় পরীক্ষা। যদি সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘ভার্বাল ভায়োলেন্স’ বা মৌখিক সহিংসতা থেকেই শারীরিক সংঘাতের সূত্রপাত হচ্ছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ
শেরপুরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সহিংসতা ও প্রাণহানি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’। সরকার সব দলকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে ভোটারদের বড় অংশ মনে করছে, সরকারের পক্ষ থেকে আরও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অনুগত নয়।