প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি অনুসন্ধানে বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে আদালত। তার নামে থাকা ব্যাংক হিসাবের বিপুল অর্থ অবরুদ্ধ (Freeze) করার পাশাপাশি তার স্ত্রী ও দুই কন্যার নামে থাকা কোটি কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ সাব্বির ফয়েজ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন।
ব্যাংক হিসাবে অবরুদ্ধ ৭৭ লাখ টাকা
আদালতের আদেশে জানানো হয়েছে, সাইফুল আলমের নামে ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসিতে পরিচালিত একটি ব্যাংক হিসাবে থাকা ৭৭ লাখ ৫৬৯ টাকা তাৎক্ষণিকভাবে অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ওই হিসাব থেকে কোনো ধরনের অর্থ উত্তোলন বা স্থানান্তর করা সম্ভব হবে না। দুদকের পক্ষ থেকে সংস্থাটির উপপরিচালক তাহাসিন মুনাবীল হক এই ‘অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ’-এর আবেদন জানিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন সংবাদমাধ্যমকে এই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্ত্রী ও দুই কন্যার নামে থাকা সম্পদ জব্দ
কেবল ব্যাংক অ্যাকাউন্টই নয়, সাইফুল আলমের পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর সম্পদও (Immovable Property) আদালতের নির্দেশে জব্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ট্রাস্ট সিটি প্রকল্পে সাইফুল আলমের স্ত্রী লুবনা আফরোজা এবং দুই কন্যা সারাহ জুমানা ও জারিফা বিনতে আলমের নামে থাকা ৫ কাঠা জমি জব্দের আদেশ দিয়েছেন বিচারক। এই জমির তৎকালীন বাজারমূল্য আনুমানিক ২ কোটি ৭৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। জমিটি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই বা সম্পদ গোপন করার আশঙ্কায় দুদক এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
সম্পদ সরাবার চেষ্টা ও দুদকের অনুসন্ধান
দুদকের অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাইফুল আলম দুদকে যে সম্পদ বিবরণী বা ‘Wealth Statement’ দাখিল করেছিলেন, তা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ বর্তমানে চলমান। তদন্ত চলাকালীন সংস্থাটি জানতে পারে যে, সাইফুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদের ব্যাংক হিসাবের অর্থ অন্যত্র হস্তান্তর বা পাচার করার চেষ্টা করছেন।
বিশেষ করে, ট্রাস্ট সিটি প্রকল্পে প্লট ক্রয়ের জন্য জমা করা টাকা তুলে নিয়ে সম্পদ গোপন বা বেহাত করার একটি সুনিশ্চিত ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। দুদকের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই যদি এই সম্পদগুলো স্থানান্তর হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপক্ষ তা উদ্ধার করতে চরম সমস্যার সম্মুখীন হবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়াকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এই ‘Asset Freezing’ ও জব্দের নির্দেশ আবশ্যক ছিল।
সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত
সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান টিম গঠন করে দুদক। ডিজিএফআই-এর মতো স্পর্শকাতর সংস্থার সাবেক প্রধানের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আদালতের এই নির্দেশের পর তার অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তল্লাশিতে আরও গতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
যৌথ বাহিনীর বর্তমান শুদ্ধি অভিযানের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের আইনি পদক্ষেপ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দুদকের পরবর্তী কার্যক্রম এবং চার্জশিট দাখিলের আগ পর্যন্ত এই অবরুদ্ধ ও জব্দ আদেশ কার্যকর থাকবে বলে জানা গেছে।