• বিনোদন
  • ভোটের গানের ‘নকল সুর’: কোটি টাকার বাজার, কপিরাইট আইন লঙ্ঘন

ভোটের গানের ‘নকল সুর’: কোটি টাকার বাজার, কপিরাইট আইন লঙ্ঘন

নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীরা জনপ্রিয় বাংলা গানের সুর নকল করে ব্যবহার করছেন। আইন অনুযায়ী এই সুর নকল করা কপিরাইট আইন, ২০২৩-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এতে কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রয়েছে।

বিনোদন ১ মিনিট পড়া
ভোটের গানের ‘নকল সুর’: কোটি টাকার বাজার, কপিরাইট আইন লঙ্ঘন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বাজছে ভোটের গান। তবে এর বেশিরভাগ গানের সুরই জনপ্রিয় বাংলা গানের হুবহু নকল। শতাধিক স্টুডিওতে তৈরি হওয়া এই ভোটের গানের বাজার কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও, মূল শিল্পী ও সুরকারের অনুমতি না নেওয়ায় কপিরাইট আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এতে জড়িত হয়েছেন হাজার হাজার ব্যক্তি।

জনপ্রিয় সুরের প্রতি প্রার্থীর ঝোঁক

ঢাকার শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও, মহাখালী ও খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত গানের সুর মূলত জনপ্রিয় গানগুলো থেকে নেওয়া। যেমন—'দুষ্টু কোকিল', 'মরার কোকিলে', 'বুক চিন চিন করছে', 'টিকাটুলীর মোড়ে একটা হল রয়েছে', 'আম্মাজান', 'খাইরুন লো', 'নয়া দামান', 'লাগে উরাধুরা' সহ আরও বহু গানের সুর ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রার্থী বা তাঁর গুণকীর্তনের কথা বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে এসব পরিচিত সুরে।

ভোটের গানের কারখানা

ঢাকার মগবাজার, বিজয়নগর ও উত্তরার বেশ কিছু স্টুডিওতে নির্বাচনী গান রেকর্ড করা হচ্ছে। উত্তরার রায়হান রেকর্ডিং স্টুডিওতে দুই শতাধিক এবং চাঁদপুরের রাজ অ্যাড মিডিয়ায় দেড় মাসে প্রায় আড়াই হাজার গান রেকর্ড করা হয়েছে। স্টুডিওগুলোর কর্ণধারেরা জানান, তাঁরা প্রার্থীকে পছন্দের সুরের 'ডেমো' পাঠান এবং সেই সুরের ওপর গান লিখে শিল্পীদের দিয়ে রেকর্ড করান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গানের কথায় শুধু প্রার্থীর নাম, প্রতীক ও আসনের নাম ভিন্ন থাকে।

পাঁচ মিনিটে গান, এআই’র ব্যবহার

চাঁদপুরের রাজ অ্যাড মিডিয়ার কর্ণধার রাব্বী রাজ জানান, অনেক প্রার্থী মৌলিক গান পাঠিয়ে নির্বাচনী গানে রূপান্তর করতে বলেন। সুর ও তাল একই রেখে কথা পরিবর্তন করা হয়। লিরিকের ওপর ভয়েস দিয়ে অটো এডিটের মাধ্যমে মাত্র পাঁচ মিনিটে একটি গান তৈরি করা সম্ভব। অপেশাদার শিল্পীদের পাশাপাশি এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই ব্যবহার করে গান তৈরি হচ্ছে। উত্তরার রায়হান রেকর্ডিং স্টুডিওতে রেকর্ড হওয়া গানগুলোর মধ্যে প্রায় ৩০টি এআই দিয়ে তৈরি। লিরিক লিখলেই এআই চারটি ভার্সন তৈরি করে, যার মধ্যে থেকে ভালো উচ্চারণযুক্ত ভার্সনটি ক্লায়েন্টকে দেওয়া হয়।

কয়েক কোটি টাকার বাজার

সংগীত বিশ্লেষকদের মতে, নকল সুরে ভোটের গানের বাজার কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। নির্বাচনী প্রচারকে সামনে রেখে শতাধিক স্টুডিওতে হাজার হাজার গান তৈরি হচ্ছে এবং এর সঙ্গে পাঁচ–ছয় হাজারের বেশি ব্যক্তি যুক্ত। প্রতিটি গান তৈরিতে স্টুডিওগুলো দু-তিন হাজার টাকা নিচ্ছে। কেবল রাজ অ্যাড মিডিয়া ও রায়হান রেকর্ডিং স্টুডিওতে রেকর্ড হওয়া ২,৭০০ গানের গড় মূল্য দুই হাজার টাকা ধরলেও অঙ্কটা অর্ধকোটির বেশি। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এই নির্বাচনে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের গান তৈরি হয়েছে।

কপিরাইট আইন লঙ্ঘন ও শাস্তির বিধান

'মরার কোকিলে' গানের গায়িকা বেবী নাজনীনসহ বহু শিল্পী ও সুরকার জানিয়েছেন, মূল গানের সুর ব্যবহারের জন্য তাঁদের কাছ থেকে কোনো স্টুডিও অনুমতি নেয়নি। বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সাবেক রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়েছেন, স্বত্বাধিকারীর অনুমতি ছাড়া কারও সুর হুবহু ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কপিরাইট আইন, ২০২৩-এর ৬৯ ধারা অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া গানের সুর নকল বা কথা পরিবর্তন করে গান তৈরি করা এই আইনের লঙ্ঘন। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে চার বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ লিরিসিস্টস, কম্পোজারস অ্যান্ড পারফরমারস সোসাইটি (বিএলসিপিএস)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হামিন আহমেদও একই সুরে কথা বলেছেন এবং স্টুডিওগুলোর কর্মকাণ্ডকে 'কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়' বলে মন্তব্য করেছেন।

Tags: election campaign copyright violation bangla music election songs music piracy studio business ai in music