বর্তমান সময়ের ব্যস্ত জীবনযাত্রা এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের ফলে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন (Hypertension) এখন ঘরে ঘরে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকরা একে ‘নীরব ঘাতক’ বলে অভিহিত করেন। তবে সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য—প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় একটি সাধারণ ফল ‘কলা’ অন্তর্ভুক্ত করলে তা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ওষুধের মতো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন কলাকে উচ্চ রক্তচাপ কমানোর অন্যতম সহায়ক ‘সুপারফুড’ (Superfood) হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সোডিয়াম-পটাশিয়ামের ভারসাম্য ও কলার ভূমিকা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল চাবিকাঠি হলো শরীরে লবণের ভারসাম্য বজায় রাখা। কলার অন্যতম প্রধান গুণ হলো এতে থাকা প্রচুর পরিমাণ পটাশিয়াম। আমাদের শরীরে সোডিয়াম (Sodium) বা লবণের পরিমাণ বেড়ে গেলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। পটাশিয়াম শরীরে এই সোডিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে দেয় এবং কিডনির মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ বের করে দিতে সাহায্য করে। এই সোডিয়াম-পটাশিয়াম ব্যালেন্স (Sodium-Potassium Balance) রক্তনালীর দেওয়ালে চাপ কমিয়ে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে।
গবেষণায় পটাশিয়ামের কার্যকারিতা চিকিৎসা বিজ্ঞানের বেশ কিছু আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল খাদ্যতালিকায় লবণ কমানোর চেয়ে পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার (যেমন কলা ও সবুজ শাকসবজি) বেশি কার্যকর হতে পারে। নিয়মিত পটাশিয়াম গ্রহণ করলে তা রক্তনালীগুলোকে শিথিল করতে সাহায্য করে, যা রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াকে সহজতর করে তোলে। যারা নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য এটি একটি প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করতে পারে।
চিকিৎসা নয়, জীবনধারার মানোন্নয়ন (Lifestyle Modification) পুষ্টিবিদদের মতে, পটাশিয়াম বেশি এবং লবণ কম এমন ডায়েট চার্ট অনুসরণ করা হাই ব্লাড প্রেশার রোগীদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে মনে রাখা জরুরি, কলা বা এই জাতীয় ফল সরাসরি ওষুধের বিকল্প নয়। এটি মূলত একটি জীবনধারার মানোন্নয়ন বা লাইফস্টাইল মডিফিকেশন (Lifestyle Modification)। নিয়মিত ব্যায়াম এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি কলা খাওয়া হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও সতর্কতা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কলার উপকারিতা অনস্বীকার্য হলেও কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে:
১. কিডনির সমস্যা: যেসব রোগী ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (Chronic Kidney Disease) বা বৃক্কের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার ডায়েটে যোগ করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ২. ওষুধের সাথে সমন্বয়: উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের যদি নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়, তবে জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন আনার আগে ডাক্তারের সাথে কথা বলা বাঞ্ছনীয়। কারণ কিছু ওষুধের সাথে অতিরিক্ত পটাশিয়াম গ্রহণের ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
পরিশেষে, সুষম খাদ্যতালিকায় পটাশিয়ামের উৎস হিসেবে কলা রাখা কেবল রক্তচাপই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং এটি হার্টের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়। সুস্থ থাকতে এবং হাইপারটেনশন থেকে মুক্তি পেতে তাই আজই আপনার খাবারের প্লেটে জায়গা করে দিন এই সহজলভ্য ফলটিকে।