ক্যানসার—শব্দটি শুনলেই এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে আমাদের। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মতো হাড় বা বোন ক্যানসারও (Bone Cancer) বর্তমানে এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত হাড়ের কোষগুলোর অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট টিউমার থেকেই এই মরণব্যাধির সূত্রপাত। চিকিৎসকদের মতে, এই ক্যানসার সাধারণত হাত, পা বা পেলভিসের দীর্ঘ হাড়গুলোকে বেশি আক্রমণ করে। তবে সঠিক সময়ে উপসর্গ চিনতে পারলে এবং উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই রোগ মোকাবিলা করা সম্ভব।
হাড়ের ক্যানসার আসলে কী?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, বোন ক্যানসার হলো এক ধরণের ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (Malignant Tumor), যা হাড়ের সুস্থ টিস্যুগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। এটি প্রধানত দুই ধরনের হতে পারে। যখন ক্যানসার সরাসরি হাড়েই তৈরি হয়, তখন তাকে প্রাইমারি বোন ক্যানসার বলা হয়। আবার শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের (যেমন: ফুসফুস, স্তন বা প্রোস্টেট) ক্যানসার কোষ যখন রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে হাড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে সেকেন্ডারি বা মেটাস্ট্যাটিক ক্যানসার (Metastatic Cancer) বলা হয়।
ক্যানসারের ধরন: সারকোমা ও লিউকেমিয়া
হাড়ের ক্যানসারকে প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগে ভাগ করা যায়: ১. সারকোমা (Sarcoma): এটি মূলত হাড়, পেশি, কারটিলেজ এবং রক্তনালিগুলোর মতো সংযোগকারী টিস্যুগুলোর ক্যানসার। ২. লিউকেমিয়া (Leukemia): এটি হাড়ের মজ্জার (Bone Marrow) ক্যানসার, যা রক্তকণিকা গঠনে বাধা দেয়।
শরীরে যেসব উপসর্গ স্পষ্ট হয়ে ওঠে
শরীরের ভেতরে ক্যানসার বাসা বাঁধলে তা কিছু নির্দিষ্ট সংকেত দিতে শুরু করে। গবেষকদের মতে, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:
তীব্র ব্যথা: হাড়ের ক্যানসারের প্রাথমিক ও প্রধান লক্ষণ হলো অসহ্য যন্ত্রণা। শুরুতে এই ব্যথা হালকা মনে হতে পারে এবং রাতে বা ভারী কাজ করলে বাড়তে পারে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই যন্ত্রণা স্থায়ী রূপ নেয়।
অস্বাভাবিক ফোলা ভাব: হাড়ের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে টিউমার হলে সেই জায়গাটি পুঁজ জমে যাওয়ার মতো ফুলে উঠতে পারে। অনেক সময় সেখানে লালচে ভাব বা স্পর্শ করলে ব্যথা অনুভূত হয়।
ভঙ্গুর হাড় (Pathological Fracture): ক্যানসারের কারণে হাড়ের ভেতরের গঠন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বড় কোনো আঘাত ছাড়াই সামান্য চাপে বা কোনো কারণ ছাড়াই আচমকা হাড় ভেঙে যেতে পারে।
চলাফেরায় বাধা: আক্রান্ত হাড় যদি জয়েন্ট বা সন্ধিস্থলের কাছাকাছি হয়, তবে নড়াচড়া করতে বা হাঁটতে প্রচণ্ড অসুবিধা হতে পারে।
অন্যান্য শারীরিক সমস্যা: এই মরণব্যাধির অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে দ্রুত ওজন কমে যাওয়া (Weight Loss), দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা ফ্যাটিগ (Fatigue), ঘন ঘন জ্বর এবং রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া (Anemia)।
কেন হয় এই ক্যানসার?
ঠিক কী কারণে হাড়ের ক্যানসার হয়, তা চিকিৎসা শাস্ত্র এখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি। তবে জিনগত সমস্যা বা রেডিয়েশন থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে অনেক সময় দায়ী করা হয়। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
প্রতিকার ও সচেতনতা
চিকিৎসকদের মতে, হাড়ের যেকোনো অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথাকে পেশির ব্যথা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা বায়োপসির (Biopsy) মাধ্যমে এই রোগ শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে সার্জারি, কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। শরীর সুস্থ রাখতে সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা বা হেলথ চেক-আপের কোনো বিকল্প নেই।