আধুনিক সভ্যতার কর্মব্যস্ত জীবনে আমাদের দৈনন্দিন রুটিন এখন অনেকটাই ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ নির্ভর। অফিসের ডেস্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে থাকা কিংবা ঘরে ফিরে সোফায় গা এলিয়ে দেওয়া—এই ‘সেডেন্টারি লাইফস্টাইল’ (Sedentary Lifestyle) বা অলস জীবনযাপন আমাদের অজান্তেই বড় কোনো বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে পিলে চমকানো তথ্য। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা দিনে একটানা ৮ ঘণ্টার বেশি বসে থাকেন, তাদের স্ট্রোক (Stroke) বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি যারা সচল থাকেন তাদের তুলনায় প্রায় ৭ গুণ বেশি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হচ্ছে ‘সিটিং ডিজিজ’ (Sitting Disease)।
শরীরে কীভাবে নিঃশব্দে থাবা বসায় স্ট্রোক?
দীর্ঘক্ষণ নড়াচড়া না করে বসে থাকলে শরীরের ভেতরে একাধিক নেতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়। গবেষকরা জানাচ্ছেন, একটানা বসে থাকার ফলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন (Blood Circulation) ধীর হয়ে যায়। এর ফলে ধমনীতে ক্ষতিকর ফ্যাট বা চর্বি জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।
দীর্ঘমেয়াদী এই স্থবিরতার কারণে রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেশার (Hypertension) অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। আর এই উচ্চ রক্তচাপই হলো ব্রেইন স্ট্রোকের প্রধান অনুঘটক। ধমনী সরু হয়ে যাওয়ায় মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছাতে পারে না, যা মুহূর্তের মধ্যে পক্ষাঘাত বা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
৬০ বছরের কম বয়সীদের ঝুঁকি কেন বেশি?
গবেষণার একটি উদ্বেগজনক দিক হলো, বয়স্কদের তুলনায় ৬০ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও প্রবল। বর্তমান যুগে তরুণ ও মধ্যবয়স্কদের শারীরিক সক্রিয়তা কমে আসায় তাদের মেটাবলিজম (Metabolism) বা বিপাক প্রক্রিয়া দ্রুত ভেঙে পড়ছে। ফলে অল্প বয়সেই স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা সরাসরি স্ট্রোকের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকদের ‘গোল্ডেন টিপস’
অফিসের কাজ বা পড়াশোনার প্রয়োজনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এড়ানো হয়তো অনেকের জন্য কঠিন। তবে এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা কিছু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন:
১. ৪৫ মিনিটের নিয়ম: একটানা বসে না থেকে প্রতি ৪৫ মিনিট অন্তর অন্তত ৫ মিনিটের জন্য একটি ছোট বিরতি নিন। এই সময়ে একটু হাঁটাচলা করুন বা শরীর টানটান (Stretching) করে নিন। ২. সচল থাকুন: অফিসে এক ডেস্ক থেকে অন্য ডেস্কে যাওয়ার জন্য বা সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলতে ইন্টারকমের বদলে হেঁটে যান। লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করার অভ্যাস করুন। ৩. শরীরচর্চা: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট নিয়ম করে ব্যায়াম বা দ্রুত হাঁটার (Brisk Walking) অভ্যাস গড়ে তুলুন। এটি শরীরের মেটাবলিজম ঠিক রাখতে সাহায্য করবে। ৪. হাইড্রেশন: পর্যাপ্ত জল পান করুন। এতে শরীর থেকে টক্সিন বেরিয়ে যায় এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে।
মনে রাখবেন, আপনার অত্যন্ত আরামদায়ক চেয়ারটি যেন আপনার অকাল মৃত্যুর কারণ বা মরণঝাঁপ হয়ে না দাঁড়ায়। শরীরকে সচল রাখুন, যান্ত্রিক জীবন থেকে বেরিয়ে নিজেকে সময় দিন। একটি ছোট পরিবর্তনই পারে আপনার জীবনকে স্ট্রোকের মরণফাঁদ থেকে রক্ষা করতে।