রপ্তানিকারকদের শঙ্কা, চট্টগ্রাম থেকে সপ্তাহখানেকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপগামী রপ্তানি পণ্যের আটকে পড়া কনটেইনার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টে পাঠানো গেলেও লিড টাইমে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না। কারণ গত সপ্তাহে যেসব মাদার ভ্যাসেলে এমএলও’র স্লট বরাদ্দ ছিল তা খালি গেছে। তাই নিয়মিত রপ্তানি পণ্যের কনটেইনারের সঙ্গে আটকে পড়া কনটেইনার যুক্ত হবে।
এতে জট লাগার আশঙ্কা রয়েছে। যা কাটতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।
বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে আনা-নেওয়া সম্ভব হয়েছে। সকাল আটটা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৯ হাজার ধারণক্ষমতার বিপরীতে কনটেইনার ছিল ৩৬ হাজার ৭০৮ টিইইউস (২০ ফুট দীর্ঘ হিসেবে)।
এর মধ্যে একক আমদানিকারকের পণ্যভর্তি কনটেইনার (এফসিএল) ২৯ হাজার ৬৫১ টিইইউস। জাহাজ থেকে আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার বন্দরে নেমেছে ১ হাজার ৫৭৭ টিইইউস। অন্যদিকে জাহাজে তোলা হয়েছে ২ হাজার ৯২৮ টিইইউস। আগের দিন বন্দরে মোট কনটেইনার ছিল ৩৭ হাজার ৩১২ টিইইউস।
সূত্র জানায়, অন্যান্য সময় চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতিতে ডেলিভারি বন্ধ থাকলেও এবার জাহাজ চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। এতে রপ্তানি, ম্যানুফেকচারিং, ভোগ্যপণ্য সরবরাহ খাত সংকটে পড়েছে। যদিও বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য খালাস ও পরিবহন স্বাভাবিক ছিল কর্মবিরতির সময়।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, প্রায় ১৪ হাজার রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার বন্দরের ইয়ার্ড, টার্মিনাল ও বিভিন্ন অফডকে আটকা পড়েছে শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে। আজ যেহেতু জাহাজ আসা-যাওয়া পুরোদমে শুরু হয়েছে তাই এসব কনটেইনার হয়তো সপ্তাহখানেকের মধ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টে চলে যাবে।
কিন্তু সেখান থেকে মাদার ভ্যাসেলে এসব কনটেইনার তুলতে সময় লাগবে। কারণ মেইন লাইন অপারেটরদের জন্য জাহাজে যে স্লট বরাদ্দ থাকে তা খালি গেছে। স্বাভাবিকভাবে নতুন ও আটকে পড়া কনটেইনার আমেরিকা ও ইউরোপের গন্তব্যে পৌঁছাতে জটে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি উদ্বেগের। এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এমএ সালাম বুধবার সন্ধ্যায় বন্দর ব্যবহারকারীদের বৈঠক শেষে বলেছিলেন, গার্মেন্টস সেক্টর বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে কাজ করবে মাত্র ১৮টি, মার্চে কাজ করবে মাত্র ১৬-১৭ দিন। এর ওপর আবার ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ থেকে চায়না বন্ধ ১৬ দিনের জন্য। আমরা অসম্ভব ক্ষতির মুখে আছি, বিশেষ করে ম্যানুফেকচারিং সেক্টর এবং রমজানের উসিলায় পুরো দেশবাসী। বন্দর যদি এভাবে বন্ধ থাকে বন্দরের যে চার্জেস আসবে তার দায়ভার ব্যবসার ওপর আসবে। ব্যবসার ওপর আসলেও ব্যবসায়ীতো আর দেবে না, আলটিমেটলি কনজিউমারের ওপর যাবে। সেই জন্যই আমরা উদ্বিগ্ন।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে বন্দরে অবরোধের কারণে আরোপিত ডেমারেজ চার্জ ছাড়াই পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার বিষয়কে কেন্দ্র করে শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলোর আন্দোলন ও কর্মবিরতির কারণে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্দরের স্বাভাবিক আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। যার কারণে বর্তমানে বন্দরে অস্বাভাবিক পণ্যজটের সৃষ্টি হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প একটি অত্যন্ত সময়সংবেদনশীল ও সময়-নির্ভর খাত। নির্ধারিত লিড টাইমের মধ্যে আমাদের উৎপাদন সম্পন্ন করে পণ্য রপ্তানি করতে হয়।
কোনো ধরনের অপারেশনাল ব্যাঘাতের কারণে যদি নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহ সম্ভব না হয়, তাহলে রপ্তানিকারকগণ তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্ডার হারানোর ঝুঁকির মুখে পড়েন।
কর্মবিরতির কারণে আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চলমান রপ্তানি আদেশগুলো সম্পন্ন করার জন্য দ্রুততার সাথে সৃষ্ট পণ্যজট নিরসন করা একান্ত জরুরি। এক্ষেত্রে দ্রুত পণ্য খালাসের নিমিত্তে কাস্টমস ও বন্দর সংক্রান্ত সব কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা ৭ দিন চলমান রাখা আবশ্যক।
বন্দরে সৃষ্ট অচলাবস্থায় আমদানিকারকরা নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাসে ব্যর্থ হয়েছেন। এখানে আমদানিকারকের কোনো ত্রুটি বা অবহেলা ছিল না। সুতরাং বর্তমান ডেলিভারিকৃত কোনো আমদানি পণ্যের বিপরীতে গত ৩০ জানুয়ারির পর থেকে ডেমারেজ চার্জ আদায় করা যুক্তিযুক্ত নয়।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বলেছেন, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার আশ্বাসে তাঁরা দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করেছেন। আশ্বাস অনুযায়ী কাজ না হলে ফের কর্মবিরতি শুরু হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত শ্রমিকনেতাদের প্রথমে ঢাকায় বদলি করলেও পরে মন্ত্রণালয় থেকে তাদের মোংলা ও পায়রায় বদলি করা হয়েছে। সর্বশেষ ১৫ কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা এক চিঠিতে এ অনুরোধ জানানো হয়। পাশাপাশি বিষয়টি তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাকেও (এনএসআই) অবহিত করা হয়েছে।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা ১৫ জনের মধ্যে রয়েছেন- চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবির, সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন, মো. ফরিদুর রহমান, মোহাম্মদ শফি উদ্দিন, রাশিদুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. জহিরুল ইসলাম, খন্দকার মাসুদুজ্জামান, হুমায়ুন কবির (এস এস পেইন্টার), মো. শাকিল রায়হান, মানিক মিঝি, মো. শামসু মিয়া, মো. লিয়াকত আলী, আমিনুর রসুল বুলবুল ও মো. রাব্বানী।