মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) প্রেক্ষাপটে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিল ইরান। তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোই হবে ইরানের প্রথম লক্ষ্যবস্তু। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে ইতিবাচক আলোচনার একদিন পরই এই কঠোর বার্তা দিলেন তিনি।
ঘাঁটি বনাম সার্বভৌমত্ব: ইরানের নতুন রণকৌশল আব্বাস আরাঘচি তার বক্তব্যে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন—ইরান কোনোভাবেই তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চায় না। তিনি বলেন, “আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ করার সক্ষমতা বা ইচ্ছা হয়তো এই মুহূর্তে নেই, কিন্তু এই অঞ্চলে তাদের প্রতিটি সামরিক ঘাঁটি আমাদের লক্ষ্যবস্তু হবে। তবে এটি পরিষ্কার করা দরকার যে, মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা মানে ওই দেশের ওপর হামলা নয়। আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে সম্মান করি, কিন্তু তাদের মাটিতে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলো আমাদের জন্য ‘Legitimate Target’ বা বৈধ লক্ষ্যবস্তু।”
ট্রাম্পের শর্ত ও পারমাণবিক বিতর্ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি ইরানের ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি করেছেন। ট্রাম্পের সাফ দাবি—ইরানকে কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (Uranium Enrichment) বন্ধ করলেই চলবে না, বরং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) উন্নয়ন প্রকল্প এবং অঞ্চলজুড়ে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (Regional Proxies) সমর্থন দেওয়াও বন্ধ করতে হবে। তবে তেহরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং এটি কেবল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনের জন্য।
কূটনৈতিক সংলাপ বনাম সামরিক হুমকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ভয় দেখিয়ে বা চাপ সৃষ্টি করে ইরানের কাছ থেকে কোনো ছাড় পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “যেকোনো গঠনমূলক সংলাপের জন্য হুমকি ও চাপমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কেবল পারমাণবিক ইস্যু (Nuclear Issue) নিয়ে আলোচনা করছি এবং অন্য কোনো আঞ্চলিক বিষয়ে আলোচনার টেবিলে বসার প্রশ্নই আসে না।” উল্লেখ্য যে, আগামী সপ্তাহের শুরুতে দুই পক্ষের মধ্যে পরবর্তী দফার বৈঠক হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও কাতার মডেল গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সাথে মিলে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর থেকেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। তখন প্রতিশোধ হিসেবে কাতারে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল ইরানি বাহিনী। আরাঘচি সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আবারও যদি একই ধরনের বোকামি করা হয়, তবে ইরান তার সামরিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করবে।
‘স্বস্তিদায়ক চুক্তি’র প্রস্তাব যুদ্ধের হুমকির মাঝেও কূটনীতির জানালা খোলা রাখতে চায় ইরান। আরাঘচি জানান, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে নিজেদের ‘অবিচ্ছেদ্য অধিকার’ মনে করলেও এ বিষয়ে একটি ‘স্বস্তিদায়ক চুক্তি’ (Comfortable Deal)-তে পৌঁছাতে তেহরান প্রস্তুত। তার মতে, বোমাবর্ষণ করে ইরানের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ফলে আলোচনার মাধ্যমেই একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম এখন ইরানের ‘মিসাইল রেঞ্জ’-এর মধ্যে থাকায় আরাঘচির এই হুঁশিয়ারি পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।