দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রভাব আরও সুসংহত করতে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে এই সফরটি দুই দেশের সুদীর্ঘ কূটনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আনোয়ার ইব্রাহিমের ভারত সফরের পর এটি নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘Return Visit’।
কুয়ালালামপুরে রাজকীয় সংবর্ধনা শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও তার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে বহনকারী বিমানটি কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (KLIA) বুঙ্গা রায়া কমপ্লেক্সে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে তাকে উষ্ণ আলিঙ্গনে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। এ সময় মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী আর রামানানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদি রয়্যাল মালয় রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়নের ‘Guard of Honor’ পরিদর্শন করেন। দুই দেশের পতাকা হাতে কুয়ালালামপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শতাধিক শিক্ষার্থী তাকে অভিবাদন জানায়। এছাড়া মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘মাদানি’ ড্রাম পারফরম্যান্স এবং লোকজ নৃত্য।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব আগামীকাল রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একটি শীর্ষ পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ভারত ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ককে ‘Comprehensive Strategic Partnership’-এ উন্নীত করার পর এটিই নরেন্দ্র মোদির প্রথম সফর। এই বৈঠকে বিশেষ করে Trade, Investment, এবং Defense সেক্টরে সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়েও আলোচনা হবে।
সেমিকন্ডাক্টর থেকে বিগ ক্যাট অ্যালায়েন্স: ডজনখানেক এমওইউ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
প্রযুক্তি ও শিল্প: সেমিকন্ডাক্টর (Semiconductor) শিল্পে যৌথ বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি বিনিময়।
শিক্ষা ও শ্রমবাজার: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বিষয়ক সহযোগিতা।
নিরাপত্তা: দুর্নীতি দমন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক নোট বিনিময়।
পরিবেশ ও প্রতিরক্ষা: জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রম এবং ভারতের নেতৃত্বাধীন ‘International Big Cat Alliance’-এ মালয়েশিয়ার অন্তর্ভুক্তি।
অর্থনৈতিক শক্তি ও বিশাল প্রবাসী গোষ্ঠী ভারত ও মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮.৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ভারত থেকে মূলত কৃষি পণ্য, পেট্রোলিয়াম এবং রাসায়নিক আমদানি করে মালয়েশিয়া; বিপরীতে মালয়েশিয়া থেকে পাম তেল এবং ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানি করা হয় ভারতে।
সাংস্কৃতিক বন্ধনের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রায় ২৯ লাখ ভারতীয় সম্প্রদায় একটি বড় ভূমিকা পালন করছে, যা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ভারতীয় প্রবাস। প্রধানমন্ত্রী মোদির এই সফর সেই প্রবাসীদের মনোবল বৃদ্ধির পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়িক ও কৌশলগত আদান-প্রদানকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
এই সফরের মধ্য দিয়ে ভারত ও মালয়েশিয়ার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসি (Act East Policy) এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।