দুধকে প্রকৃতির এক অনন্য দান এবং ‘সুপারফুড’ হিসেবে গণ্য করা হয়। মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান ও প্রোটিনের এক দুর্দান্ত উৎস হলো এই পানীয়। তবে দুধ পানের ক্ষেত্রে সময় এবং নিয়ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে খালি পেটে দুধ পান করলে শরীরে ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়ে এবং এর পুষ্টিগুণ কীভাবে আমাদের সুস্থ রাখে, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহলের শেষ নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতে, দুধে থাকা ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম এবং ফসফরাস আমাদের পেশি ও হাড়ের গঠন মজবুত করতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
দুধের পুষ্টিগুণ: এক নজরে এক কাপ (প্রায় ২৪৪ গ্রাম) গরুর দুধে থাকে ১৪৬ ক্যালোরি এবং ৮ গ্রাম প্রোটিন। এছাড়া এতে রয়েছে ৮ গ্রাম চর্বি, দৈনিক চাহিদার ২৮ শতাংশ ক্যালসিয়াম, ২৪ শতাংশ ভিটামিন-ডি, ২৬ শতাংশ রিবোফ্লাভিন (B2), ১৮ শতাংশ ভিটামিন-বি১২ এবং ১০ শতাংশ পটাশিয়াম। এছাড়াও এতে ফসফরাস ও সেলেনিয়ামের মতো মূল্যবান খনিজ উপাদান রয়েছে যা শরীরের মেটাবলিজম (Metabolism) উন্নত করে।
১. প্রোটিনের ‘কমপ্লিট’ উৎস দুধ একটি উচ্চমানের প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। একে ‘কমপ্লিট প্রোটিন’ (Complete Protein) বলা হয়, কারণ এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নয়টি এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড বিদ্যমান। দুধে মূলত দুই ধরনের প্রোটিন থাকে—কেসিন (Casein) এবং হুই প্রোটিন (Whey Protein)। এর মধ্যে কেসিন পেশি ক্ষয় রোধে এবং হুই প্রোটিন ব্যায়ামের সময় শরীরে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তা করে। খালি পেটে দুধ পান করলে এই প্রোটিন দ্রুত শোষিত হয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে তোলে।
২. হাড়ের সুরক্ষা ও অস্টিওপরোসিস প্রতিরোধ হাড়ের সুস্বাস্থ্যের জন্য ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি-এর কোনো বিকল্প নেই। দুধে থাকা ভিটামিন-কে২ (Vitamin K2) হাড়কে শক্ত করার পাশাপাশি অস্টিওপরোসিস (Osteoporosis) এবং হাড়ের ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে বয়স্ক নারী ও পুরুষদের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সমস্যা দূর করতে প্রতিদিন এক গ্লাস হালকা গরম দুধ পান করা মহৌষধ হিসেবে কাজ করতে পারে।
৩. ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ফ্যাট বার্নিং অনেকেই মনে করেন দুধ খেলে ওজন বাড়ে, তবে গবেষণায় দেখা গেছে এর উল্টো চিত্র। দুধে থাকা লিনোলিক অ্যাসিড (Linoleic Acid) শরীরের অতিরিক্ত চর্বি বা ফ্যাট ভাঙতে সাহায্য করে। উচ্চ-প্রোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় দুধ পান করলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে, যা অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়।
৪. কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও হার্টের সুরক্ষা প্রতিদিন নিয়ম করে লো-ফ্যাট যুক্ত দুধ পান করলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল (LDL)-এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যদিকে, এটি ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল (HDL)-এর মাত্রা বাড়িয়ে হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে। হার্টের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুধের পটাশিয়াম উপাদান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ভূমিকা রাখে।
৫. স্বাস্থ্যকর ও উজ্জ্বল ত্বক দুধে থাকা ভিটামিন-বি১২ এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বককে ভেতর থেকে পুষ্টি জোগায়। নিয়মিত দুধ পান করলে ত্বক নরম, তরতাজা এবং উজ্জ্বল থাকে। বার্ধক্যের ছাপ দূর করতে এবং ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে দুধের ভূমিকা অপরিসীম।
পরিশেষে, দুধের নানাবিধ উপকারিতা থাকলেও যাদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স (Lactose Intolerance) বা দুগ্ধজাত খাবারে এলার্জি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে খালি পেটে দুধ পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যথায়, সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জন্য দুধ হতে পারে দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি।