আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততায় প্রতিদিন রান্নার সময় সুযোগ অনেকেরই নেই। তাই সপ্তাহান্তের একদিনে অনেকটা রান্না করে ফ্রিজে তুলে রাখা এখন অধিকাংশ গৃহস্থালির সাধারণ চিত্র। সকালের বেঁচে যাওয়া খাবার রাতে কিংবা রবিবারের ঝোল পরের সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত খাওয়ার অভ্যাস আমাদের অনেকেরই মজ্জাগত। কিন্তু হিমশীতল এই সিন্দুক কি আপনার খাবারকে সত্যিই নিরাপদ রাখছে? পুষ্টিবিদদের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণের সামান্য ভুলে আপনার পুষ্টিগুণ (Nutrients) তো কমছেই, উল্টো খাবার হয়ে উঠছে বিষাক্ত। অজান্তেই আপনি আপনার শরীরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নীরব ঘাতক সব মারণ রোগকে।
চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ফ্রিজের খাবার ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে সতর্কবার্তাগুলো আমাদের মেনে চলা জরুরি:
১. পুষ্টিগুণ যখন শূন্যের কোঠায় ফ্রিজের কনকনে ঠান্ডা পরিবেশ খাবারকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করলেও তার স্বাদ ও গুণাগুণ ধরে রাখতে পারে না। রান্নার ৩ থেকে ৪ দিন পর থেকেই খাবারে থাকা প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেলস দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। বিশেষ করে শাক-সবজি বা ডাল জাতীয় খাবার দীর্ঘক্ষণ ফ্রিজে রাখলে তা কেবল পেট ভরায়, শরীরকে কোনো প্রকার পুষ্টি সরবরাহ করে না। ফলে আপনার অজান্তেই শরীরে পুষ্টির ঘাটতি বা ‘নিউট্রিশনাল ডেফিসিয়েন্সি’ (Nutritional Deficiency) দেখা দেয়।
২. অদৃশ্য ঘাতক: লিস্টেরিয়া ও সালমোনেলা অনেকেই মনে করেন ফ্রিজে রাখলে সব জীবাণু মরে যায়। এটি একটি চরম ভ্রান্ত ধারণা। ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি শ্লথ হয় ঠিকই, কিন্তু তারা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয় না। অনেকদিন ধরে রাখা খাবারে ‘লিস্টেরিয়া’ (Listeria) বা ‘সালমোনেলা’র (Salmonella) মতো বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া জন্ম নিতে পারে। এই জীবাণুগুলো থেকে তীব্র ‘ফুড পয়জনিং’ (Food Poisoning) হতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী রূপ নেয়।
৩. বারবার গরম করার ‘থার্মাল শক’ ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে সামান্য একটু নিয়ে বাকিটা আবার তুলে রাখা কিংবা পুরো পাত্রটি বারবার গরম করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাপমাত্রার এই ঘনঘন পরিবর্তন বা ‘থার্মাল সাইক্লিং’-এর ফলে খাবারের প্রাকৃতিক এনজাইম (Enzymes) নষ্ট হয়ে যায়। এই ধরণের খাবার হজম করা শরীরের জন্য অত্যন্ত কঠিন। নিয়মিত এমন খাবার খেলে দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস, অ্যাসিডিটি, বদহজম এমনকি পেটের আলসার পর্যন্ত হতে পারে।
৪. সংরক্ষণের বিজ্ঞানসম্মত উপায়: যা জানা জরুরি চিকিৎসকরা নিরাপদ খাবার সংরক্ষণের জন্য কয়েকটি ‘গোল্ডেন রুল’ অনুসরণের পরামর্শ দিচ্ছেন:
বায়ুরোধী পাত্র (Air-tight Container): খাবার সবসময় উন্নত মানের এয়ার-টাইট কন্টেনারে রাখুন। এতে বাইরের আর্দ্রতা বা অন্য খাবারের দুর্গন্ধ যেমন ছড়ায় না, তেমনি অক্সিডেশন প্রক্রিয়াও ধীর হয়।
ক্রস-কনটামিনেশন রোধ: কাঁচা মাছ-মাংস এবং রান্না করা খাবার কখনোই পাশাপাশি বা এক তাকে রাখবেন না। কাঁচা খাবারে থাকা ব্যাকটেরিয়া সহজেই রান্না করা খাবারে স্থানান্তরিত হতে পারে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘ক্রস-কনটামিনেশন’ (Cross-contamination) বলা হয়।
সময়ের সীমারেখা: সাধারণ ফ্রিজে রাখা রান্না করা খাবার ৩ দিনের বেশি খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ভাতের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ২৪ ঘণ্টার বেশি হওয়া মোটেও উচিত নয়।
৫. পুষ্টিবিদের বিশেষ টিনস: কীভাবে খাবেন? ফ্রিজ থেকে খাবার বের করার সাথে সাথেই তা ওভেনে বা গ্যাসে দেবেন না। প্রথমে অন্তত ১০-১৫ মিনিট ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় (Room Temperature) রেখে দিন। এরপর মাইক্রোওয়েভের বদলে সরাসরি কড়াই বা পাতিলে গ্যাসে ভালো করে ফুটিয়ে নিন। উচ্চতাপে ফুটিয়ে নিলে সুপ্ত ব্যাকটেরিয়াগুলো ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
সুস্থ থাকতে এবং রোগমুক্ত দীর্ঘ জীবন পেতে সতেজ ও টাটকা খাবার খাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ফ্রিজকে কেবল জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করুন, অভ্যাসে নয়।