বাঙালি হেঁশেলের চিরন্তন এক দ্বন্দ্ব—রান্নায় কোন তেল সেরা? সয়াবিন না কি সরিষা? বিগত কয়েক দশকে বিজ্ঞাপন আর বিপণন কৌশলে সয়াবিন তেল আমাদের রান্নাঘর দখল করলেও, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদরা এখন ফিরে তাকাচ্ছেন শিকড়ের দিকে। হৃদরোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি আর মেটাবলিক ডিসঅর্ডারের এই যুগে ভোজ্য তেলের নির্বাচনই ঠিক করে দিচ্ছে আপনার পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা। সম্প্রতি পুষ্টিবিদদের দেওয়া নতুন তথ্যে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।
সরিষার তেল: কেন একে হৃদযন্ত্রের বন্ধু বলা হয়? প্রাচীন কাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে সরিষার তেলের ব্যবহার ঐতিহ্যের অংশ। পুষ্টিবিদদের মতে, দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি ‘ঘানি ভাঙা’ বা কোল্ড-প্রেসড (Cold-pressed) সরিষার তেল আসলে পুষ্টির এক বিশাল ভাণ্ডার। এতে ওমেগা-৩ (Omega-3) এবং ওমেগা-৬ (Omega-6) ফ্যাটি অ্যাসিডের এক আদর্শ অনুপাত থাকে, যা হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা সচল রাখতে সহায়ক।
সরিষার তেলের সবচেয়ে বড় গুণ হলো এতে থাকা মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড (Monounsaturated Fatty Acids)। এটি শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল (LDL) কমিয়ে দেয় এবং ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল (HDL) বাড়াতে সাহায্য করে। এর বিশেষ ঝাঁঝালো স্বাদের মূলে রয়েছে ‘অ্যালিল আইসোথায়োসায়ানেট’ নামক উপাদান, যা ক্যান্সার কোষ প্রতিরোধে (Cancer-fighting properties) বিশেষ ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়।
সয়াবিন ও পরিশোধিত তেলের অন্ধকার দিক বাজারচলতি অধিকাংশ সয়াবিন বা রিফাইন্ড অয়েল (Refined Oil) বাজারজাত করার সময় অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিশোধিত করা হয়। পুষ্টিবিদদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় তেলের প্রাকৃতিক গুণাগুণ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় এবং এতে মারাত্মক ‘ট্রান্স ফ্যাট’ (Trans Fat)-এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
এই ধরণের তেল দীর্ঘকাল ব্যবহারের ফলে শরীরে মেদ জমা বা স্থূলতা (Obesity), টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও, রিফাইন্ড তেল শরীরে ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীকালে হার্ট ব্লকেজ বা কার্ডিওভাসকুলার রোগের (Cardiovascular Disease) প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্মোকিং পয়েন্ট: রান্নার বিজ্ঞান কী বলছে? রান্নার ক্ষেত্রে তেলের ‘স্মোকিং পয়েন্ট’ (Smoking Point) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটি হলো সেই তাপমাত্রা, যার ওপরে গেলে তেল ভেঙে গিয়ে ক্ষতিকর ধোঁয়া ও রাসায়নিক তৈরি করে। সরিষার তেলের স্মোকিং পয়েন্ট অনেক বেশি (প্রায় ২৫০° সেলসিয়াস), তাই ডিপ ফ্রাই বা উচ্চ তাপে রান্নার জন্য এটিই সবচেয়ে নিরাপদ।
বিপরীতে, সয়াবিন তেল বা অনেক পরিশোধিত তেল উচ্চ তাপে দ্রুত অক্সিডাইজড (Oxidized) হয়ে যায় এবং ফ্রি-র্যাডিক্যাল তৈরি করে, যা কোষের ডিএনএ-র ক্ষতি করতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে এবং হার্টের আর্টারি বা ধমনীকে পরিষ্কার রাখতে বিশেষজ্ঞরা পুনরায় বিশুদ্ধ সরিষার তেলে ফিরে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন।
পুষ্টিবিদের চূড়ান্ত রায়: স্বাস্থ্যের চাবিকাঠি ঘানি ভাঙা তেলে পুষ্টিবিদদের মতে, কেবল তেলের ধরণ নয়, সেটি কোন প্রক্রিয়ায় নিষ্কাশন করা হচ্ছে তাও জরুরি। বাজারের কেমিক্যাল মেশানো তেলের চেয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘানি ভাঙা খাঁটি সরিষার তেলই আধুনিক যুগের ‘হেলথ ড্রিঙ্কস’। হার্টের সুস্থতা বজায় রাখতে এবং শরীরে মেদ জমতে না দিতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সরিষার তেলের পরিমিত ব্যবহার আপনার জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। মনে রাখবেন, সঠিক তেলের নির্বাচন কেবল স্বাদ নয়, আপনার হার্টের সুরক্ষার প্রথম ধাপ।