বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ থাকলেও, চা পানের উৎসবে কোনো ঋতুভেদ নেই। এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা ছাড়া দিন শুরু করার কথা ভাবতেই পারেন না এদেশের আপামর জনতা। আলস্য দূর করতে কিংবা কাজের চাপে নিজেকে চনমনে রাখতে চায়ের বিকল্প মেলা ভার। তবে আধুনিক জীবনযাত্রার ব্যস্ততায় আমরা অনেকেই একবারে অনেকটা চা বানিয়ে ফ্লাস্কে রেখে দিই কিংবা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা বারবার ওভেনে গরম করে পান করি। আপাতদৃষ্টিতে এটি সাধারণ অভ্যাস মনে হলেও, চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন এক ভয়ংকর আশঙ্কার কথা। বারবার ফোটানো চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া আসলে নিজের অজান্তেই শরীরে মারণ রোগকে আমন্ত্রণ জানানো।
পুষ্টিগুণ যখন বিষে রূপান্তরিত হয় চা পাতায় প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট (Antioxidants) যেমন— ক্যাটেচিন (Catechin) এবং পলিফেনল (Polyphenols) থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু চা যখন বারবার ফোটানো হয়, তখন এই উপকারী উপাদানগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এর পরিবর্তে চায়ের লিকারে ট্যানিন (Tannin)-এর মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত ট্যানিন শরীরের আয়রন (Iron) শোষণে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে। ফলে নিয়মিত পুনরায় গরম করা চা পান করলে শরীরে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া (Anemia) এর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ব্যাকটেরিয়ার স্বর্গরাজ্য ও ফুড পয়জনিং বিশেষ করে যারা দুধ-চিনি দিয়ে চা খেতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য বিপদ আরও বেশি। দুধ ও চিনি মিশ্রিত চা যদি দীর্ঘক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা হয়, তবে তাতে দ্রুত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া (Bacteria) জন্মাতে শুরু করে। দীর্ঘক্ষণ রাখা চা পুনরায় গরম করলে সেই ব্যাকটেরিয়াগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয় না, বরং তাপ পেয়ে অনেক সময় আরও বিষাক্ত হয়ে ওঠে। এর ফলে হজমের মারাত্মক গোলমাল, বমি এবং ফুড পয়জনিং (Food Poisoning)-এর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ক্রনিক অ্যাসিডিটি ও লিভারের ক্ষতি বারবার ফোটানো চা পাকস্থলীর অম্ল-ক্ষারকের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এর ফলে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী বুকজ্বালা বা হার্টবার্ন (Heartburn), অম্বল এবং গ্যাস্ট্রিক আলসার (Gastric Ulcer) তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, চায়ের এই রাসায়নিক পরিবর্তন শরীরের মেটাবলিজম (Metabolism) কমিয়ে দেয় এবং লিভারের এনজাইমগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যারা দীর্ঘকাল এই অভ্যাসে অভ্যস্ত, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পেটের পীড়া বা লিভারের জটিলতা দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
সুস্থ থাকতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ চায়ের প্রকৃত স্বাদ ও স্বাস্থ্যগুণ বজায় রাখতে চিকিৎসকরা কিছু নির্দিষ্ট গাইডলাইন বা নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন: ১. চা সর্বদা টাটকা বা ফ্রেশ খাওয়ার চেষ্টা করুন। ২. চা বানানোর সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে তা পান করে নেওয়া উচিত। ৩. যদি চা ঠান্ডা হয়েই যায় এবং গরম করতেই হয়, তবে পুনরায় চা পাতা দিয়ে ফোটাবেন না। কেবল হালকা তাপে লিকারটি গরম করে নিন। ৪. দুধ চা একবার ঠান্ডা হয়ে গেলে তা পুনরায় গরম করা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন।
সুস্থ থাকতে এবং দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতা এড়াতে চা পানের এই ক্ষতিকর অভ্যাস আজই বর্জন করা জরুরি। মনে রাখবেন, এক কাপ সতেজ চা যেমন আপনার ক্লান্তি দূর করতে পারে, তেমনি ভুল পদ্ধতিতে তৈরি চা আপনার জীবননাশের কারণও হতে পারে।