• দেশজুড়ে
  • বগুড়ায় ভোটকেন্দ্রিক সংঘর্ষের করুণ পরিণতি: ছেলের চোখ হারানোর খবরে মায়ের মৃত্যু, রণক্ষেত্র নন্দীগ্রাম

বগুড়ায় ভোটকেন্দ্রিক সংঘর্ষের করুণ পরিণতি: ছেলের চোখ হারানোর খবরে মায়ের মৃত্যু, রণক্ষেত্র নন্দীগ্রাম

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
বগুড়ায় ভোটকেন্দ্রিক সংঘর্ষের করুণ পরিণতি: ছেলের চোখ হারানোর খবরে মায়ের মৃত্যু, রণক্ষেত্র নন্দীগ্রাম

ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় লণ্ডভণ্ড জনপদ; বিএনপি নেতার বাড়িতে নারকীয় তান্ডব ও গুরুতর জখমের খবরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে প্রাণ হারালেন বৃদ্ধা মা।

নির্বাচনী উত্তাপ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই বগুড়ার নন্দীগ্রামে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। ভোটের টাকা বিতরণকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এক নেতার চোখ নষ্ট হওয়ার খবর শুনে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তার জন্মদাত্রী মা। থালতা-মাঝগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানা ওরফে মজিদের ওপর বর্বরোচিত হামলার খবর সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত (Heart Attack) হয়ে মারা গেছেন মাজেদা বেগম। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

নিশুতি রাতে রণক্ষেত্র পারশন গ্রাম স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টার দিকে নন্দীগ্রাম উপজেলার থালতা-মাঝগ্রাম ইউনিয়নের পারশন গ্রামে এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়। অভিযোগ ওঠে, দাঁড়িয়ে থাকা ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পক্ষে ভোট কেনার উদ্দেশ্যে স্থানীয় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা বেলাল হোসেন ও জামায়াত কর্মী ফারুক হোসেন টাকা বিলি করছিলেন। ধানের শীষের সমর্থকরা তাদের হাতেনাতে ধরে কিছু অর্থসহ ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি মাসুদ রানার বাড়িতে আটকে রাখেন এবং পুলিশকে খবর দেন।

কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যখন রাত ১২টার দিকে প্রায় অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেলে করে লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে একদল জামায়াত-শিবির কর্মী মাসুদ রানার বাড়িতে হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা বাড়িঘরে ভাঙচুর চালায় এবং আটকে রাখা কর্মীদের ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এই তান্ডবের মধ্যেই মাসুদ রানার একটি চোখে মারাত্মক আঘাত করা হয়।

পুত্রের আর্তনাদ ও জননীর বিদায় মঙ্গলবার বগুড়া প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে আহত বিএনপি নেতার ছেলে সিয়াম আকন্দ কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “মধ্যরাতে জামায়াত-শিবিরের লোকজন আমাদের বাড়িতে ঢুকে নারকীয় তান্ডব চালায়। আমার বাবার চোখে আঘাত করে তা নষ্ট করে দেওয়া হয়। এই নৃশংস খবরটি শোনার পরপরই আমার দাদি মাজেদা বেগম তীব্র আতঙ্ক ও শোকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।”

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা এবং বগুড়া-৪ আসনের প্রার্থী মোশারফ হোসেন এই ঘটনাকে ‘সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন। তারা জানান, গুরুতর আহত মাসুদ রানা বর্তমানে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (SZMC) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জামায়াতের পাল্টা অভিযোগ ও অবস্থান এদিকে, একই দিন বগুড়া প্রেসক্লাবে পাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেন বগুড়া-৪ আসনের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ড. মোস্তফা ফয়সাল পারভেজ। তিনি বিএনপির আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, জামায়াত টাকা দিয়ে ভোট কেনাতে বিশ্বাস করে না। তিনি উল্টো অভিযোগ করেন যে, ভাটগ্রাম ইউনিয়নে তাদের কর্মী আব্দুল্লাহ হেল গালিব বিএনপি কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন। পারশন গ্রামের ঘটনাকে তিনি ‘এলাকাবাসীর প্রতিরোধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন যে, তাদের কর্মীদের অন্যায়ভাবে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছিল। তিনি প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক তৎপরতা ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে এই ধরনের সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় নন্দীগ্রামের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের ট্রমা (Trauma) তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, কোনো ধরনের উসকানিতে যেন পরিস্থিতি আরও অবনতি না ঘটে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে একজন মায়ের এই মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি জনপদকে শোকাতুর করেনি, বরং দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে সহিংসতার ভয়াবহ চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

Tags: election violence political conflict bogra news bnp jamaat police monitoring mother death vote buying nandigram clash eye injury human tragedy