ভাত ছাড়া বাঙালির রসনাবিলাস এক প্রকার অসম্ভব। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় শর্করার প্রধান উৎস হিসেবে ভাত একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে। তবে সাম্প্রতিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের গবেষণা এই চিরাচরিত খাদ্যাভ্যাস নিয়ে এক উদ্বেগের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে রাতের বেলা অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভাত খাওয়ার অভ্যাস শরীরের জন্য মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কার্বোহাইড্রেটের আধিক্য ও ক্যালরি সমীকরণ
ভাত মূলত একটি উচ্চ শর্করা বা ‘কার্বোহাইড্রেট’ (Carbohydrate) সমৃদ্ধ খাবার। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৫০ গ্রাম ভাতে প্রায় ২০০ ক্যালরি (Calorie) থাকে। পুষ্টিবিদদের মতে, এই ক্যালরির পরিমাণ আমাদের শরীরের প্রয়োজনে অতিরিক্ত হতে পারে, যা সরাসরি মেদ বা পেটে চর্বি জমার জন্য দায়ী। ভাত খাওয়ার ফলে রক্তে ‘সুগার লেভেল’ (Sugar Level) অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা শরীরের অভ্যন্তরীণ বিপাক প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৩০ বছরের পর যে পরিবর্তনগুলো উদ্বেগের
চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, মানুষের বয়স ৩০ বছর পার হওয়ার পর থেকে ‘বেসাল মেটাবলিক রেট’ (Basal Metabolic Rate - BMR) কমতে শুরু করে। অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ক্যালরি পোড়ানোর ক্ষমতা হ্রাস পায়। এই সময়ে যাদের দিনে কয়েকবার ভাত খাওয়ার প্রবণতা থাকে, তাদের মধ্যে ওবেসিটি (Obesity), টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং এমনকি দীর্ঘমেয়াদী মানসিক অবসাদ (Mental Depression) দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ও হার্ভার্ডের গবেষণা
বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন সাদা ভাত খাওয়ার অভ্যাস টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। ভাত খাওয়ার পর তা থেকে নিসৃত গ্লুকোজ (Glucose) আমাদের রক্তে অত্যন্ত দ্রুত মিশে যায়। রাতের বেলা শরীর সাধারণত নিষ্ক্রিয় থাকে, তাই ঘুমানোর আগে উচ্চ শর্করাযুক্ত খাবার খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে ইনসুলিনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
ব্রাউন রাইস বনাম হোয়াইট রাইস: ভুল ধারণা
অনেকেই মনে করেন সাদা ভাতের বদলে ব্রাউন রাইস (Brown Rice) বা লাল চালের ভাত খেলে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। তবে সত্যটা কিছুটা ভিন্ন। পুষ্টিবিদদের মতে, দুই ধরনের চালে ‘ক্যালরি’ ও ‘কার্বোহাইড্রেটে’র মাত্রা প্রায় সমান। যদিও ব্রাউন রাইসে ফাইবার (Fiber), প্রোটিন ও আয়রন বেশি থাকে, তবে এতে ‘আর্সেনিক’ (Arsenic) এর উপস্থিতি পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাই চাল যে রঙেরই হোক না কেন, পরিমিতি বোধই এখানে আসল চাবিকাঠি।
সুস্থ থাকতে রাতে ভাত খাওয়ার বিশেষ নিয়ম
রাতের খাবারে ভাতের অপকারিতা এড়াতে পুষ্টিবিদরা কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রদান করেছেন:
১. পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ (Portion Control): রাতের খাবারে ভাতের পরিমাণ এক কাপের বেশি হওয়া উচিত নয়। ২. সবজির অনুপাত: ভাতের পরিমাণের চেয়ে তিন গুণ বেশি রঙিন সবজি, তরকারি ও সালাদ খাদ্যতালিকায় রাখুন। ৩. সময়ের গুরুত্ব: ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের ডিনার (Dinner) শেষ করুন। এতে পরিপাকতন্ত্র পর্যাপ্ত সময় পায়। ৪. বর্জনীয় পানীয়: ভাতের সঙ্গে কোনো ধরনের চর্বিযুক্ত খাবার বা ‘কোল্ড ড্রিংকস’ (Cold Drinks) গ্রহণ করবেন না। ৫. শারীরিক সক্রিয়তা: ভাত খাওয়ার পরপরই বিছানায় না গিয়ে বাড়িতে কিছুটা হাঁটাচলা করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
বাঙালি সংস্কৃতিতে ভাত অপরিহার্য হলেও সুস্বাস্থ্যের স্বার্থে এর ব্যবহার হওয়া উচিত বিজ্ঞানসম্মত। পরিমিত বোধ এবং সঠিক সময়জ্ঞানই পারে প্রিয় এই খাবারকে বিপদমুক্ত রাখতে।