চলমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্মের দাবদাহ এখন কেবল অস্বস্তির কারণ নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যারা ‘ক্রনিক’ (Chronic) অসুখ যেমন ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাদের জন্য এই তীব্র গরম প্রাণঘাতী হতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, একজন সুস্থ মানুষের তুলনায় একজন ডায়াবেটিস রোগীর ‘হিট স্ট্রোক’ (Heat Stroke) হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি। রক্তে শর্করার ভারসাম্যহীনতা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করাই এর মূল কারণ।
তীব্র গরমে ডায়াবেটিস রোগীদের অতিরিক্ত ঝুঁকি এবং জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ডিহাইড্রেশন ও রক্তে শর্করার বিপজ্জনক বৃদ্ধি
রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে শরীর অতিরিক্ত চিনি প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে জল বেরিয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অসমোটিক ডাইইউরেসিস’ বলা হয়। গরমের সময় ঘামের সাথে শরীর থেকে আরও জল বেরিয়ে যাওয়ায় দ্রুত ‘ডিহাইড্রেশন’ (Dehydration) তৈরি হয়। জলশূন্য শরীরে ইনসুলিনের ঘনত্ব বেড়ে যায়, যা সুগার লেভেলকে আরও অনিয়ন্ত্রিত করে তোলে। তাই তৃষ্ণা না পেলেও দিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার জল পান করা বাধ্যতামূলক।
২. নার্ভ ড্যামেজ ও ঘাম নিঃসরণে বাধা
দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যাকে ‘ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি’ (Diabetic Neuropathy) বলা হয়। এটি শরীরের ঘাম গ্রন্থি বা ‘সোয়েট গ্ল্যান্ড’ (Sweat Gland)-এর কার্যকারিতা নষ্ট করে দিতে পারে। শরীর যখন পর্যাপ্ত ঘাম নিঃসরণ করতে পারে না, তখন অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে শরীর দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ‘হিট এক্সহশন’ বা সরাসরি হিট স্ট্রোকের দিকে ধাবিত হয়। এই ঝুঁকি এড়াতে প্রখর রোদে শারীরিক পরিশ্রম থেকে বিরত থাকা জরুরি।
৩. ইনসুলিন ও গ্লুকোমিটারের কার্যকারিতা রক্ষা
প্রচণ্ড তাপ কেবল শরীরের নয়, ওষুধেরও ক্ষতি করে। ইনসুলিন এক ধরনের প্রোটিন, যা অতিরিক্ত তাপে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। তেমনি ভাবে গ্লুকোমিটার এবং ‘টেস্ট স্ট্রিপ’ (Test Strip) উচ্চ তাপমাত্রায় সঠিক ফলাফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে। তাই ইনসুলিন সবসময় ঠান্ডা জায়গায় (ফ্রিজের নরমাল চেম্বারে) সংরক্ষণ করা উচিত। ভ্রমণের সময় ‘কুল প্যাক’ বা ইনসুলেটেড ব্যাগে ওষুধ বহন করা বুদ্ধিমানের কাজ। সরাসরি সূর্যালোক থেকে গ্লুকোমিটারকে দূরে রাখা ‘টেকনিক্যাল’ নির্ভুলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. খাদ্যাভ্যাসে ‘ডাইইউরেটিক’ পানীয় বর্জন
গরমে তৃষ্ণা মেটাতে অনেকেই কোল্ড ড্রিঙ্কস, অতিরিক্ত চা বা কফির ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু ক্যাফেইনযুক্ত এই পানীয়গুলো শরীরকে আরও জলশূন্য করে দেয়। এর পরিবর্তে প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয় যেমন ডাবের জল, চিনি ছাড়া লেবুর শরবত বা পাতলা ঘোল গ্রহণ করা উচিত। এটি শরীরের ‘ইলেক্ট্রোলাইট ব্যালেন্স’ (Electrolytic Balance) বজায় রাখতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
৫. পোশাক নির্বাচন ও পায়ের বিশেষ যত্ন
হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক শরীরের তাপ বিকিরণে সাহায্য করে। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পায়ের সুরক্ষা। নিউরোপ্যাথির কারণে পায়ে অনুভুতি কম থাকতে পারে, ফলে গরম পিচ বা বালিতে খালি পায়ে হাঁটলে ফোসকা বা ইনফেকশন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা পরবর্তীতে ‘ডায়াবেটিক ফুট আলসার’ (Diabetic Foot Ulcer)-এ রূপ নিতে পারে। তাই গরমে আরামদায়ক জুতো ও মোজা পরিধান করা এবং নিয়মিত পা পরীক্ষা করা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে ‘লাইফস্টাইল মডিফিকেশন’ (Lifestyle Modification) হলো সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তাপমাত্রার এই যুগে সামান্য সচেতনতাই পারে একজন ডায়াবেটিস রোগীকে বড় ধরনের শারীরিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।