আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। দিনভর কাজের চাপ, ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং মানসিক উদ্বেগের কারণে ‘ইনসোমনিয়া’ (Insomnia) বা অনিদ্রা এখন ঘরে ঘরে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম ছাড়া সুস্বাস্থ্য কল্পনা করা অসম্ভব। আর এই সমস্যার প্রাকৃতিক ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারে প্রাচীন যোগব্যায়াম বা ‘ইয়োগা’ (Yoga)। বিশেষ করে ‘বজ্রাসন’ নামক সহজ একটি আসন অনিদ্রা দূর করতে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ কর্মক্ষমতা বাড়াতে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
যোগাসন: শরীর ও মনের একাত্মতা
যোগাসনের মূল দর্শন হলো শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে প্রকৃতির ছন্দে আত্মস্থ করা। এটি কেবল ব্যায়াম নয়, বরং শরীর ও মনের একটি ‘হিলিং প্রসেস’ (Healing Process)। নিয়মিত যোগাভ্যাসে শরীরের ‘মেটাবলিজম’ (Metabolism) উন্নত হয়, অতিরিক্ত ক্যালোরি ঝরে এবং শরীর সুগঠিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত বজ্রাসন অনুশীলন করলে স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয়, যা দ্রুত ঘুমানোর জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
বজ্রাসন কেন অনন্য?
বজ্রাসন হলো ‘মেডিটেশন’ (Meditation) বা ধ্যানের একটি বিশেষ ভঙ্গি। যোগব্যায়ামের অন্যান্য আসন সাধারণত খালি পেটে করার নিয়ম থাকলেও বজ্রাসনের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এটিই একমাত্র আসন যা ভরা পেটে বা খাবার খাওয়ার ঠিক পরেই করা যায় এবং এতে হজম প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়। সহজসাধ্য হওয়ায় সব বয়সের মানুষই এটি অনায়াসে চর্চা করতে পারেন।
বজ্রাসনের ১০টি অবিশ্বাস্য স্বাস্থ্যগুণ
নিয়মিত বজ্রাসন অনুশীলনে যে শারীরিক পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়, তা এক কথায় জাদুকরী:
১. পায়ের গঠন: নিয়মিত অভ্যাসে পায়ের পেশি ও হাড়ের গঠন সুঠাম ও মজবুত হয়। ২. মেরুদণ্ড ও অঙ্গবিন্যাস: মেরুদণ্ড সোজা রাখতে সাহায্য করে এবং দেহের ‘পোজিশন’ (Posture) উন্নত করে। ৩. চুল পড়া রোধ: রক্ত সঞ্চালন উন্নত হওয়ায় চুল পড়ার সমস্যা নাটকীয়ভাবে কমে আসে। ৪. হজমশক্তি বৃদ্ধি: এটি পাকস্থলীর রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে ‘ডাইজেশন’ (Digestion) প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে ও পেটের গোলযোগ দূর করে। ৫. সায়াটিকা থেকে মুক্তি: ‘সায়াটিকা’ (Sciatica) বা স্নায়ুর ব্যথায় ভুগছেন এমন রোগীদের জন্য এটি দারুণ উপকারী। ৬. পেশি শক্তিশালীকরণ: শরীরের নিম্নভাগের পেশিগুলোর নমনীয়তা ও শক্তি বৃদ্ধি পায়। ৭. ব্যথা নিরাময়: আর্থ্রাইটিস (Arthritis), কোমর, কাঁধ ও হাঁটুর দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা দূর করতে এই আসন কার্যকর। ৮. অনিদ্রা দূরীকরণ: মস্তিষ্ককে শান্ত করে গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমে সহায়তা করে। ৯. পায়ের খিল ধরা: পায়ের পাতায় টান লাগা বা খিল ধরার সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। ১০. পাইলস নিয়ন্ত্রণ: দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে পাইলসের মতো রোগ সারাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বজ্রাসন অনুশীলনের সঠিক পদ্ধতি
বজ্রাসন করার জন্য কোনো জটিল প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে আপনি সহজেই এটি করতে পারেন:
প্রথমে সমতল স্থানে দুই পা সামনের দিকে ছড়িয়ে সোজা হয়ে বসুন।
এবার ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে দুই পায়ের গোড়ালি জোড়া করে তার ওপর বসুন। খেয়াল রাখবেন যেন আপনার মেরুদণ্ড একদম সোজা থাকে।
আপনার দুই হাত দুই উরুর ওপর সোজা করে রাখুন।
দৃষ্টি সামনের দিকে রেখে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিন।
শুরুতে অন্তত ২০ সেকেন্ড এই ভঙ্গিতে থাকুন এবং ধীরে ধীরে সময় বাড়িয়ে ২ থেকে ৫ মিনিট পর্যন্ত করতে পারেন।
সুস্থ জীবনধারার জন্য নিয়মিত এই ছোট অভ্যাসটি আপনার শারীরিক ও মানসিক অবসাদ কাটিয়ে তুলতে ‘গেম চেঞ্জার’ (Game Changer) হিসেবে কাজ করতে পারে।