বাঙালির পাতে এক চামচ গাওয়া ঘি মানেই রাজকীয় স্বাদ আর সুগন্ধের মেলবন্ধন। কিন্তু আধুনিক বাজার ব্যবস্থায় যে ঘি আমরা চড়া দামে কিনছি, তা কি আদৌ স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ? এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় ঘিয়ে মেশাচ্ছে ডালডা, সেদ্ধ আলু, স্টার্চ (Starch) কিংবা ক্ষতিকারক কেমিক্যাল। যা অজান্তেই আপনার শরীরে বড় ধরনের রোগের বাসা বাঁধছে। আপনার কেনা ঘিটি কতটা নিরাপদ তা যাচাই করার জন্য কোনো বড় ল্যাবরেটরিতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের রান্নাঘরেই ৪টি সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারেন পণ্যের মান (Quality Control)।
১. হাতের তালুর পরীক্ষা: শরীরের তাপমাত্রায় ‘পিউরিটি টেস্ট’
খাঁটি ঘি চেনার সবচেয়ে প্রাথমিক ও সহজ উপায় হলো শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার সাথে এর প্রতিক্রিয়া (Reaction) দেখা। হাতের তালুতে সামান্য পরিমাণ ঘি নিন। যদি ঘিটি প্রকৃতপক্ষেই খাঁটি হয়, তবে এটি হাতের ছোঁয়ায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দ্রুত গলে যাবে। কারণ খাঁটি ঘিয়ের গলনাঙ্ক অত্যন্ত কম। অন্যদিকে, যদি ঘি গলতে সময় নেয় বা হাতে ঘষার পরও দানা দানা থেকে যায়, তবে বুঝবেন এতে ভেজাল চর্বি বা ডালডা মেশানো হয়েছে।
২. গরম করার পরীক্ষা: রঙের বদলেই লুকানো সত্য
কড়াইতে বা একটি বড় চামচে এক চামচ ঘি নিয়ে আগুনের শিখার ওপর ধরুন। ঘি যদি সাথে সাথে তরল হয়ে যায় এবং এর রঙ গাঢ় বাদামী (Deep Brown) হয়ে যায়, তবে নিশ্চিত থাকুন এটি উচ্চমানের ঘি। এর কারণ হলো খাঁটি ঘি খুব দ্রুত ‘ক্যারামেলাইজ’ হয়। কিন্তু যদি ঘি গলতে অনেকটা সময় নেয় এবং গলে যাওয়ার পর এর রঙ হালকা হলদেটে থেকে যায়, তবে বুঝতে হবে এতে অখাদ্য কেমিক্যাল কিংবা বনস্পতি চর্বি মেশানো হয়েছে।
৩. আয়োডিন টেস্ট: স্টার্চ বা সেদ্ধ আলু শনাক্ত করার বৈজ্ঞানিক উপায়
অনেক সময় ঘিয়ে ওজন বাড়াতে সেদ্ধ আলু কিংবা গুঁড়ো স্টার্চ মেশানো হয়। এটি পরীক্ষা করতে সামান্য পরিমাণ ঘি গলিয়ে একটি পাত্রে নিন। এবার তাতে দু-তিন ফোঁটা আয়োডিন সলিউশন (Iodine Solution) বা টিংচার আয়োডিন মিশিয়ে দিন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর যদি ঘিয়ের রঙ বেগুনি বা গাঢ় নীল হয়ে যায়, তবে সেটি ভেজালের চূড়ান্ত প্রমাণ। আয়োডিন স্টার্চের সংস্পর্শে এলে নীল রঙ ধারণ করে, যা থেকে সহজেই বোঝা যায় আপনার ঘিয়ে শর্করা জাতীয় পদার্থ মেশানো হয়েছে।
৪. লবণ ও চিনির মিশ্রণ: ডালডা বা বনস্পতি শনাক্তকরণ
ঘিয়ের সাথে ডালডা বা বনস্পতির মিশ্রণ খুবই সাধারণ একটি কারচুপি। এটি ধরতে একটি কাঁচের পাত্রে এক চামচ ঘি নিন। তাতে সামান্য পরিমাণ লবণ এবং এক চিমটি চিনি মেশান। মিশ্রণটি ৫-১০ মিনিট স্থিরভাবে রেখে দিন। যদি সময়ের সাথে সাথে ঘিয়ের নিচের স্তরের রঙ বদলে লালচে বা গোলাপি আভা ধারণ করে, তবে বুঝবেন এতে ডালডা বা বনস্পতির উপস্থিতি রয়েছে। খাঁটি ঘিয়ের ক্ষেত্রে রঙের কোনো পরিবর্তন হবে না।
কেন এই সতর্কতা প্রয়োজন?
ভেজাল ঘি কেবল খাদ্যের স্বাদ নষ্ট করে না, এটি হৃদরোগ, ওবেসিটি এবং হজমের সমস্যার অন্যতম কারণ। দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে সর্বদা বিশ্বস্ত উৎস থেকে ঘি সংগ্রহ করা এবং নিয়মিত বিরতিতে এই ‘হোম টেস্ট’ (Home Test) করা অত্যন্ত জরুরি। খাঁটি খাবারের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে আপনার পরিবারের সুস্বাস্থ্য।