কেন আসে এই রহস্যময় জ্বর? শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকা মানেই হলো আপনার ইমিউন সিস্টেম (Immune system) কোনো না কোনো সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। চিকিৎসকদের মতে, যক্ষ্মা (Tuberculosis), লিম্ফোমা, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া কিংবা এইচআইভি (HIV)-র মতো গুরুতর ইনফেকশনের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে এই দীর্ঘমেয়াদী জ্বর। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ফোড়া (যেমন লিভার বা ফুসফুসের অ্যাবসেস), কানেকটিভ টিস্যু ডিজিজ (যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা এসএলই), হাইপারথাইরয়েডিজম এবং এমনকি ফুসফুস, লিভার বা কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রেও শরীরে অল্প অল্প জ্বর স্থায়ী হতে পারে।
উপসর্গ দেখে রোগ চেনার উপায় জ্বর আসার ধরণ এবং এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক উপসর্গগুলো বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য রোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে:
যক্ষ্মা (TB): যদি জ্বর প্রধানত বিকেলের দিকে আসে এবং রাতে ঘাম দিয়ে ছেড়ে যায়, সেই সঙ্গে দুই সপ্তাহের বেশি কাশি ও ওজন হ্রাস (Weight loss) পায়, তবে তা যক্ষ্মার লক্ষণ হতে পারে।
লিম্ফোমা: দীর্ঘদিনের জ্বরের সঙ্গে রাতে ঘাম হওয়া, চুলকানি, জন্ডিস কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশের গ্রন্থি বা গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া ক্যানসার বা লিম্ফোমার ইঙ্গিত দেয়।
লিভার বা ফুসফুসের জটিলতা: জ্বরের সঙ্গে পেটের ডান দিকের উপরিভাগে ব্যথা ও জন্ডিস থাকলে লিভারে ফোড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার কাঁপুনি দিয়ে জ্বরের সঙ্গে দুর্গন্ধযুক্ত হলুদ কাশি ফুসফুসের ইনফেকশনের লক্ষণ।
কালাজ্বর: দীর্ঘস্থায়ী জ্বরের সঙ্গে যদি রুচি ঠিক থাকা সত্ত্বেও ওজন দ্রুত কমে এবং রক্তশূন্যতা দেখা দেয়, তবে কালাজ্বর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
অটোইমিউন ডিজিজ: গিঁটে গিঁটে ব্যথা, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর জড়তা এবং মুখে ঘায়ের সঙ্গে জ্বর থাকলে তা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা এসএলই (SLE) এর মতো কানেকটিভ টিস্যু রোগের লক্ষণ হতে পারে।
অসহ্য যন্ত্রণায় তাৎক্ষণিক ঘরোয়া সমাধান দীর্ঘদিন জ্বর শরীরে থাকলে পেশির ব্যথা ও ক্লান্তি জীবনকে বিষিয়ে তোলে। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে শরীরকে কিছুটা স্বস্তি দিতে আপনি কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি (Home Remedies) অনুসরণ করতে পারেন:
১. পর্যাপ্ত হাইড্রেশন (Hydration): জ্বরের কারণে শরীরে জলশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন তৈরি হয়। তাই প্রচুর পরিমাণে পানি, ফলের রস বা ওরাল স্যালাইন পান করুন। স্যুপ বা হার্বাল টি মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে। ২. বিশ্রাম: সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শরীর প্রচুর শক্তি খরচ করে। তাই পূর্ণ বিশ্রাম বা ‘বেড রেস্ট’ দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করবে। ৩. জলপটি ও স্পঞ্জিং: মাথায় জলপটি দেওয়া জ্বর কমানোর চিরচেনা ও কার্যকর পদ্ধতি। শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি মনে হলে ঠান্ডা পানি দিয়ে পুরো শরীর মুছে (Sponging) নিতে পারেন। ৪. গার্গল: ঠান্ডা লেগে গলা ব্যথাসহ জ্বর এলে আদা ও লবণ মিশ্রিত কুসুম গরম পানি দিয়ে বারবার গার্গল করুন। এতে গলার ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে আসে। ৫. পুষ্টিকর তরল খাবার: এ সময় ভারী খাবারের বদলে সহজে হজমযোগ্য তরল খাবার গ্রহণ করুন। আইস কিউব চুষে খাওয়াও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়ক হতে পারে।
কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে? মনে রাখবেন, প্যারাসিটামল সাময়িকভাবে জ্বর কমালেও রোগের মূল কারণ নির্মূল করতে পারে না। যদি জ্বর তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয়, জ্বরের সঙ্গে তীব্র কাঁপুনি থাকে কিংবা অস্বাভাবিক ওজন কমতে শুরু করে, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক সময়ে ডায়াগনস্টিক (Diagnostic) পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করাই হতে পারে সুস্থ হয়ে ওঠার একমাত্র পথ।