ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সূচনালগ্নেই ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ও আদর্শিক দ্বন্দ্বে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং ‘Constitution Reform Commission’ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেও নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। মূলত জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থানের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণেই এই ‘Political Boycott’ বা রাজনৈতিক বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
সংসদ কক্ষে রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত ব্লকে ১১ দলীয় জোটের শরিকদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দীর্ঘ আলোচনার পর এনসিপির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যদিও তারা এমপি হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ, তবে নতুন সরকারের ‘Cabinet Swearing-in’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থেকে তারা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছেন।
ফেসবুক পোস্টে বিস্ফোরক আব্দুল্লাহ আল আমিন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এই সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এনসিপি সংবিধান সংস্কার এবং সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেবে। কিন্তু বিএনপি যেভাবে ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা’কে পাশ কাটিয়ে কেবল সরকার গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেছে, তার প্রতিবাদে তারা মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করছেন।
তিনি তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, “জনগণ আমাদের ‘Mandate’ দিয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য। আমরা সেই ম্যান্ডেট রক্ষায় দুটি শপথই (এমপি ও সংস্কার পরিষদ) নিয়েছি। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতামুখী দল হিসেবে সংস্কারের শপথ এড়িয়ে গিয়ে জনরায়ের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেছে।”
বিএনপি বনাম এনসিপি: আদর্শিক সংঘাতের কেন্দ্রে সংস্কার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বর্জনের মধ্য দিয়ে সংসদের বিরোধী শিবিরে থাকা দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপির একটি বড় ধরনের ফাটল দৃশ্যমান হলো। বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ‘Constitution Reform Commission’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অনীহা প্রকাশ করায় ক্ষুব্ধ হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিকরা। এনসিপির অভিযোগ, বিএনপি কেবল ‘Power-hungry’ বা ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতিতে লিপ্ত, যেখানে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকারটি ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় এর প্রভাব কতটুকু? বিকেল ৪টায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে তারেক রহমান ও তাঁর মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের কথা থাকলেও এনসিপির এই অনুপস্থিতি নতুন সরকারের জন্য একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যদিও বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করছে, তবুও জুলাই বিপ্লবের শরিক দলগুলোর এমন অনড় অবস্থান আগামীর সংসদীয় রাজনীতিকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে।
বিরোধী দলের শক্তিশালী ভূমিকার ইঙ্গিত সংসদে ৬৮টি আসন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্র ১১ দলীয় জোট একটি সুসংগঠিত বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। এনসিপির এই সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামীতে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিটি ধাপে তারা সরকারকে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনবে। ‘State Reform’ এবং ‘Democratic Values’ রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস না করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে এনসিপি নেতৃত্ব।